• পশ্চিমবঙ্গের সর্বপ্রথম বিজেপি সরকারের শপথ কর্মসূচিকে জাতীয় স্তরের কর্মসূচি করার তোড়জোড়, আসছেন কে কে?
    আনন্দবাজার | ০৭ মে ২০২৬
  • নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের আহ্বান ছিল— বিজেপি-কে ‘প্রচণ্ড বহুমত’ (বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা) দিন। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা সে আহ্বান শুনে হয়তো খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু অনেকেই ভেবেছিলেন, ও সব কথার কথা, প্রচারের মঞ্চ থেকে ও রকম বলতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের যা জনবিন্যাস, তাতে ‘বহুমত’ জুটলেও তা ‘প্রচণ্ড’ হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের সংশয় ছিল।

    তবে সমস্ত সংশয় ধুয়েমুছে দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পেয়েছে বিজেপি। তাই উদ্‌যাপনের পরিকল্পনাও বিপুলই। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নেবেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সে অনুষ্ঠান শুধু পশ্চিমবঙ্গের অনুষ্ঠান থাকছে না। এ রাজ্যে বিজেপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানকে জাতীয় স্তরের কর্মসূচির রূপ দিতে চলেছে বিজেপি।

    শপথ আগামী শনিবার। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে। বুধবার দুপুর থেকেই ব্রিগেড ময়দানে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। যে রকম জাঁকজমকের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে প্রস্তুতির জন্য তিন-চার দিন সময় কমই। প্রধানমন্ত্রী মোদী ছিলেন বিজেপির প্রচারের ‘প্রধান মুখ’। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ তো ছিলেনই, ছিলেন এই নির্বাচনী যুদ্ধে বিজেপির প্রধান সেনাপতি। ‘যুদ্ধজয়’-এর পর শপথগ্রহণের মঞ্চে এই দু’জনের উপস্থিতিই যে সবচেয়ে ‘আলোকিত’ হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তবে শুধু প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, রাজনাথ সিংহ, নিতিন গডকড়ী, জেপি নড্ডাদের মতো যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা দলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি, তাঁরাও পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথে থাকতে পারেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। থাকবেন বিজেপির বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও।

    শপথের আগে অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেওয়ার পর্ব রয়েছে। শুক্রবার, ৮ মে কলকাতাতেই সে পর্বের আয়োজন হচ্ছে। নিউটাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক দলের প্রথম বৈঠক ডাকা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসাবে শাহ সেখানে উপস্থিত থাকবেন। সহ-পর্যবেক্ষক হিসাবে থাকবেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মাঝি। সেই বৈঠকেই আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষিত হবে বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা তথা পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম। পরের দিন তিনিই ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে শপথ নেবেন। শনিবার ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ শপথ নেবেন কি না, তা বুধবার পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। বিজেপি সূত্রের খবর, পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা শপথ না-ও নিতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়া দু’জন উপমুখ্যমন্ত্রী এবং আরও কয়েকজন মন্ত্রীর শপথ সেই মঞ্চ থেকে হতে পারে। তবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।

    পশ্চিমবঙ্গের জয় কতটা বড় ঘটনা, তা গোটা দেশকেই বোঝাতে চাইছে বিজেপি। তাই অন্যান্য বিজেপি বা এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরও ব্রিগেডে হাজির করার কথা ভাবা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া এখন ২১টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিজেপির সরকার রয়েছে। প্রত্যেকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং উপমুখ্যমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে শনিবারের ব্রিগেডে। অসম ও পুডুচেরিতে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের মতোই সদ্য নির্বাচন শেষ হয়েছে। ফলে সেখানেও নতুন করে সরকার গড়ার তোড়জোড় চলছে। তাই ওই দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের শপথে আসতে পারবেন কি না, সংশয় রয়েছে। আরও কয়েকটি রাজ্যের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ওই তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে আসার ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি, উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিংহ সৈনী, মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব-সহ যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সকলকেই শপথের মঞ্চে হাজির করার চেষ্টা চলছে।

    নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে কলকাতা প্রায় অচলই হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি ব্যবস্থাপনাও নিশ্ছিদ্র করা হচ্ছে। কলকাতা পুলিশ সে দিন ব্রিগেড সমাবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে কমবেশি তিন হাজার কর্মীকে মোতায়েন করছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার নিজে এবং অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার স্তরের আধিকারিকরাও রাস্তায় নামছেন। ব্রিগেড ময়দান-সহ সংলগ্ন এলাকাকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে আলাদা আলাদা টিমকে নজরদারির দায়িত্বে রাখা হবে। আশপাশের উঁচু বাড়িগুলি থেকে নজরদারি চলবে। নজরদারি চলবে আকাশ থেকেও। তা ছাড়া মোতায়েন করা হবে কেন্দ্রীয় বাহিনীও।

    রবীন্দ্রজয়ন্তীতে শপথ। ফলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা সাংস্কৃতিক উপাস্থপনা নিয়েও নানা পরিকল্পনা চলছে। মূল মঞ্চের পাশাপাশি আলাদা সাংস্কৃতিক মঞ্চ তৈরি করার কথা প্রাথমিক ভাবে ভাবা হয়েছে। ‘ভিভিআইপি’ আমন্ত্রিতেরা মূল মঞ্চেই থাকবেন। মঞ্চের সামনের কিছুটা অংশে থাকবে বিশিষ্ট অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। তবে গোটা দর্শকাসন জুড়েই চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা করার কথা ভাবা হয়েছে।

    শপথ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ব্রিগেডে জমায়েতের কেমন চেহারা বিজেপি তৈরি করতে চায়, তা নিয়ে দলের তরফ থেকে কেউ কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। কিন্তু বিজেপি সূত্রের খবর, প্রত্যেক বিধায়ককেই লোকজন আনার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কারও জন্য কম, কারও জন্য বেশি নয়। প্রত্যেক বিধায়ককেই অন্তত এক হাজার লোক আনতে বলা হয়েছে। তবে কেউ তার বেশি আনলেও ক্ষতি নেই। যে সব আসনে বিজেপি জেতেনি, সেখান থেকেও শপথ অনুষ্ঠানে কর্মী-সমর্থকদের আনতে বলা হয়েছে। সংখ্যা কী হবে, তা স্থানীয় সংগঠনের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    সকাল ১০টা থেকে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হবে বলে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বুধবার জানিয়েছেন। তবে কর্মসূচি কিছুটা দীর্ঘই হবে। ব্রিগেড সমাবেশের দিন যতটা সময় লেগেছিল, শপথ সমাবেশেও প্রায় ততক্ষণ সময় লাগতে পারে বলে বিজেপি নেতৃত্বের অনুমান। পশ্চিমবঙ্গের জয় বিজেপির কাছে কতটা মূল্যবান, তার ব্যাখ্যা সোমবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভাষণে শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সে উপলব্ধি গোটা দেশেই বিজেপি চারিয়ে দিতে চাইছে। ব্রিগেডে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিজেপি আসলে পশ্চিমবঙ্গ জয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য গোটা দেশকে বোঝাতে চাইছে।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)