আরজি কর কাণ্ডে ৩ আইপিএস সাসপেন্ড! খতিয়ে দেখা হবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভূমিকা, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু
আনন্দবাজার | ১৫ মে ২০২৬
আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের তদন্তে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেন্ড করা হল রাজ্যের তিন আইপিএস অফিসারকে। শুক্রবার নবান্ন থেকে এ কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, আরজি করের চিকিৎসকের ধর্ষণ এবং খুনের মামলার ফাইল আবার খোলা হচ্ছে। ওই সময়ে বিভিন্ন পদে কর্মরত তিন আইপিএস অফিসার বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে। আপাতত তাঁদের সাসপেন্ড করা হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে জানিয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।
২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সময় আইপিএস বিনীত ছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার। আরজি কর কাণ্ডের পর প্রবল আন্দোলনের মুখে তাঁর পদত্যাগের দাবি ওঠে। জুনিয়র চিকিৎসকদের লাগাতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সে বছরের সেপ্টেম্বরে বিনীতকে কলকাতার সিপি থেকে সরিয়ে এসটিএফের এডিজি পদে বদলি করে দেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক ছিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (নর্থ) পদে। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে তাঁকেও ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আইপিএস ইন্দিরা তখন কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) পদে দায়িত্বরত ছিলেন। আরজি কর কাণ্ড পরবর্তী বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কলকাতা পুলিশের ‘মুখ’ হিসাবে বার বার খবরের শিরোনামে এসেছিলেন তিনি।
বর্তমানে বিনীত রাজ্যের ডিজি (আইবি) পদে কাজ করছেন। অভিষেক ইএফআরের কমান্ডান্ট পদে কাজ করেন। পদমর্যাদায় ডিআইজি। আর ইন্দিরা এখন সিআইডির স্পেশ্যাল সুপারিনটেনডেন্ট।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কথায়, ‘‘অ্যাজ় আ হোম মিনিস্টার, আমি চার্জ নেওয়ার পর মাননীয় চিফ সেক্রেটারি এবং মাননীয় হোম সেক্রেটারির কাছে লিখিত চেয়েছিলাম আরজি করের ঘটনা এবং তার পরবর্তী কিছু বিষয় নিয়ে। কী ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকেরা সেটা হ্যান্ডল করেছিলেন, তা জানতে চেয়েছিলাম। তথ্য অনুসন্ধানের পর আপাতত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিলাম।’’ শুভেন্দুর সংযোজন, ‘‘রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী হিসাবে আমি ঘোষণা করছি, ওই সময়ে যা ঘটেছিল, তা মিসহ্যান্ডলিং করা, যথাযথ ভাবে এফআইআর করে পদক্ষেপ করার মতো প্রাথমিক যে বিষয়গুলো ছিল, সেখানে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল দু’জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, নির্যাতিতার মাকে রাজ্য সরকারের হয়ে টাকা দিতে চেয়েছিলেন।’’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের বাদ দিয়ে বাকি তদন্ত হবে। নইলে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে না। সিবিআইয়ের তরফে যে তদন্ত হচ্ছে, সেখানে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন নেই। রাজ্য সরকারের তরফে রাজ্যের পুলিশের ভূমিকা দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এক রকমের ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তার তদন্ত হবে। ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের সঙ্গে কাদের কাদের কথা হয়েছিল, কল লিস্ট, হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাট খতিয়ে দেখা হবে। পরে বার করব। তখন কার কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তখনকার মুখ্যমন্ত্রী কিংবা কোনও মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে কি না, কোনও নির্দেশ ছিল কি না, সব বার করব। এগুলো তদন্তের অংশ।’’
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘ওই সময়ে এক জন ডিসি সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন। সেখানে তাঁর শরীরীভাষা এবং মুখের ভাষা রাজ্যের জন্য সুখকর ছিল না। তিনি ওই সময়ে সরকারি ভাবে কলকাতা পুলিশের মুখপাত্র ছিলেন না। তথ্য নিয়েছি, উনি স্বরাষ্ট্র দফতরেরও মুখপাত্র ছিলেন না। কেউ কাগজে তাঁকে দায়িত্ব দেয়নি। কেউ মৌখিক ভাবে হয়তো আরজি কর কাণ্ডের পর ওঁকে সর্বসমক্ষে বিবৃতি দিতে বলেছিলেন। সেগুলো তদন্তসাপেক্ষ।’’ তার পরেই ‘আপাতত পদক্ষেপ’ হিসাবে রাজ্যের তিন আইপিএসকে সাসপেন্ড করার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু।
উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই শুভেন্দু ঘোষণা করেছিলেন আবার আরজি কর মামলার তদন্ত শুরু হবে। ইতিমধ্যে বিজেপির টিকিটে জিতে পানিহাটি থেকে বিধায়ক হয়েছেন নির্যাতিতার মা। বুধবার তিনি আদালতে যান তিন জনের গ্রেফতারির দাবিতে। ওই তিন জন হলেন পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দাস এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়।পানিহাটির বর্তমান বিধায়কের অভিযোগ, তাঁর নির্যাতিতা মেয়ের দেহের দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছিল। নথি হস্তান্তর না-করে তড়িঘড়ি দেহ দাহ করা হয়েছিল।
শুভেন্দুর ঘোষণার পরে নির্যাতিতার মা তথা পানিহাটির বিধায়ক বলেন, ‘‘আগের সরকার কোনও পদক্ষেপ করেনি। মেয়ের কেসে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপে আমরা খুশি।’’