• বালি পাচারে ১৪৫ কোটির দুর্নীতি, চার্জশিট শরাফের বিরুদ্ধে
    এই সময় | ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: নদী থেকে বেআইনি ভাবে বালি তোলার পরে সরকারি ‘ক্যারিং অর্ডার’ জাল করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুট করছিল জিডি মাইনিং নামে একটি সংস্থা। ওয়াটার মার্ক এবং বারকোড দেওয়া নথি এমন ভাবে জাল করা হতো যে, রাস্তায় বালি বোঝাই লরি আটক করা হলেও, বুদ্ধু বনে যেতেন পুলিশ এবং সরকারি আধিকারিকরাও!

    এ ভাবেই প্রশাসনের ‘চোখে বালি’ দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ঝাড়গ্রামের সুবর্ণরেখা নদী থেকে বালি পাচার করছিলেন ওই সংস্থার কর্ণধার অরুণ শরাফ এবং তাঁর কর্মীরা। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ দায়ের হতেই তদন্ত শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। অবশেষে বালি পাচারের তদন্তে ৫৭ দিনের মাথায় জিডি মাইনিং সংস্থার ডিরেক্টর অরুণ শরাফ–সহ ৪ কর্মীর বিরুদ্ধে শনিবার বিচারভবনের বিশেষ আদালতে চার্জশিট পেশ করে কেন্দ্রীয় সংস্থা ইডি।

    তদন্তকারীদের দাবি, এখনও পর্যন্ত ১৪৫ কোটি টাকার দুর্নীতির হদিশ পাওয়া গিয়েছে। মোট ১৪টি শেল কোম্পানির মাধ্যমে টাকা নয়ছয় হয়েছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। সোমবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি।

    এ দিন বিশেষ আদালতে ৪,৭০০ পাতার নথি পেশ করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। সেখানে বলা হয়েছে, বালি পাচারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ৯ জন সাক্ষ্যও দিয়েছেন। এদের প্রায় সকলে অরুণের অবৈধ কার্যকলাপের বিষয়ে প্রথম থেকেই অবগত ছিলেন বলেও দাবি ইডির। মূলত তাঁদের বয়ানের ভিত্তিতেই গত ৬ নভেম্বর অরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্যান্ড মাইনিং ট্রান্সপোর্ট স্টোরেজ ও সেল’–এর নিয়মের তোয়াক্কা না করে নদী থেকে বালি তুলে পাচার করত অরুণের সংস্থা ‘জিডি মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড’।

    সূত্রের খবর, ওই কোম্পানিতে ২ জন ডিরেক্টর পদে রয়েছেন। অরুণ ছাড়াও নাম রয়েছে তাঁর মা মায়া শরাফের। মূল কোম্পানি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি সংস্থা খুলেছিলেন অরুণ। সেই কোম্পানিতে ডিরেক্টর হিসেবে অন্যরা থাকলেও পুরো কারবার কন্ট্রোল করতেন অরুণ নিজে। ধাপে ধাপে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং পূর্ব মেদিনীপুরের মাইনিংয়ের লাইসেন্স নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দপ্তর খুলে বেআইনি ব্যবসা করছিল তাঁর সংস্থা।

    ঝাড়গ্রামের দুটি থানায় তিনটি এফআইআরের ভিত্তিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর বালিপাচারের তদন্তে নেমে অরুণের বেআইনি কারবারের তথ্য তল্লাশ করে ইডি। তাতেই বিস্তর গরমিল ধরা পড়ে। ইডির দাবি, ২০২৪–২০২৫ সালের যে ব্যালেন্সশিট রয়েছে কোম্পানির, তাতে দেখা যাচ্ছে ১০৩ কোটি টাকার বালি বিক্রিতে, কোম্পানির অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে ১৩০ কোটির বেশি!

    সেই সূত্র ধরে বিগত কয়েক বছরের হিসেব খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা। তাতে আরও গরমিল ধরা পড়ে বলে দাবি ইডি–র । দেখা যায়, সরকারি ‘ক্যারিং ওর্ডার’ বা ই–চালান জাল করে বিপুল মুনাফা করেছেন অরুণ। অর্থাৎ রাজ্য সরকার বছরে যে পরিমাণ বালি (সিএফটি) নদী থেকে তোলার অনুমতি দেয়। তার থেকে অনেক বেশি বালি তুলে বিভিন্ন রাজ্যে পাঠিয়েছেন অরুণ।

    ঝাড়গ্রামের পাশাপাশি কলকাতা, নদিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরেও তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় তদন্তকারী অফিসারেরা। সূত্রের খবর, গোপীবল্লভপুরের সুবর্ণরেখা নদীতে বালি তোলার কাজে অরুণের সব থেকে ঘনিষ্ঠ ছিলেন সেখানকার বাসিন্দা শেখ জহিরুল আলি। তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নথি উদ্ধার করা হয়। জহিরুলের নামও চার্জশিটে রয়েছে।

    সূত্রের খবর, নদী থেকে বালি তোলার পরে শুরু হতো পরবর্তী পর্যায়ের জালিয়াতি। প্রতিটি লরি বালি নিয়ে যাওয়ার সময়ে চালকের কাছে ই–চালান বা ক্যারিং অর্ডার থাকা বাধ্যতামূলক। ওই ই–চালানে সরকারের তরফে ‘ইউনিক বারকোড’, ‘ইউনিক কুইক রেসপন্স কোড’, ‘ওয়াটার মার্ক’ ছাড়াও গাড়ি নম্বর দেওয়া থাকে। এমনকী, কোথায় বালি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সব কিছুর তথ্যও উল্লেখ থাকে।

    সেই নথি জাল করা হতো বলে অভিযোগ। রাস্তায় কোনও পুলিশ আধিকারিক বালির লরি ধরলে, সেই চালান স্ক্যান করে দেখে নিতে পারেন, তা বৈধভাবে ট্রান্সপোর্ট করা হচ্ছে কি না। সেখানেই শরাফের বালির লরি পাকড়াও করে ‘ধোকা’ খেয়ে যেতেন পুলিশকর্মী এবং সরকারি আধিকারিকরা! গোটা ঘটনায় পুলিশ ও সরকারি অফিসারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই অবৈধ কারবার চলছিল বলে ইডির সন্দেহ। সে কারণে পরবর্তী ধাপে ইডির তদন্তের অভিমুখ ‘সন্দেহভাজন’ ওই আধিকারিকদের দিকে।

  • Link to this news (এই সময়)