সংবাদদাতা, কাঁথি: একসময় ছাত্রীদের কলরোলে গমগম করত। আর এখন গা-ছমছমে ভূতুড়ে বাড়ি। বন্ধ স্কুল এখন যেন হানাবাড়ির চেহারা নিয়েছে। স্কুলের বিল্ডিং ভেঙে পড়েছে। উপরে উঠেছে গাছ। ঝোপঝাড় আর আগাছার আস্তরণে ঢেকে গিয়েছে স্কুলটি। খেজুরির মোহাটি বিমল স্মৃতি গার্লস হাইস্কুলের এই হাল। ২০২১সালে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আর খোলেনি। এলাকাবাসীর দাবি, আবার নতুন করে স্কুলটি চালু করা হোক। কিংবা সেখানে সরকারি উদ্যোগে শিক্ষা সংক্রান্ত কোনও প্রকল্প গড়ে তোলা হোক।
হেঁড়িয়া থেকে দেবীচক যাওয়ার পাকা রাস্তার পাশে ১৯৭১সালে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। অকালে প্রয়াত হওয়া পুত্র মেধাবী বিমলের স্মৃতিতে স্কুল গড়ার জন্য জায়গা দিয়েছিলেন এলাকার বাসিন্দা বনবিহারী মিশ্র। তাছাড়া সেইসময় হেঁড়িয়া শিবপ্রসাদ ইন্সটিটিউশন বয়েজ স্কুল ছিল। এলাকায় একটি গার্লস স্কুল প্রয়োজন ছিল। তা অনুভব করে কয়েকজন শিক্ষানুরাগী এগিয়ে আসেন। তাঁদের উদ্যোগে বনবিহারীবাবুর দেওয়া আড়াই বিঘা জায়গার উপর স্কুলটি গড়ে ওঠে। ওইবছর প্রতিষ্ঠা হলেও সরকারি অনুমোদন পায় ১৯৭৪ সালে। এখানে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েরা পড়াশোনা করত। প্রথম থেকে কমবেশি ৫০জনের বেশি ছাত্রী ছিল। ২০১০সাল নাগাদ একশোর কাছাকাছি ছাত্রী হয়ে যায়। সেইসময় টিচার ইনচার্জ ছিলেন জেলা পরিষদের প্রাক্তন সদস্যা তথা খেজুরি-১ পঞ্চায়েত সমিতির বর্তমান শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ রাজবালা খাটুয়া। তিনি ২০১২সালে অবসর নেন। তারপর টিআইসি নিযুক্ত হন মালবিকা গিরি। সেইসময় তাঁকে নিয়ে তিনজন শিক্ষিকা ছিলেন। নিয়োগ না হওয়ায় আগে থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষিকার অভাব ছিল। তাছাড়া পরিকাঠামোরও অভাব ছিল। এখান থেকে হেঁড়িয়া হাইস্কুল প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। হাইস্কুলটি প্রথমে বয়েজ থাকলেও পরবর্তীকালে কো-এড হয়। আর দেবীচক হাইস্কুল জুনিয়র থাকলেও পরবর্তীকালে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদন পায়। চার কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে কলিয়াচক গার্লস হাইস্কুলও। ছাত্রীরা ওই স্কুলগুলিতে চলে যেতে থাকে। রাজ্য সরকারের সবুজসাথী প্রকল্পে সাইকেল পেয়ে তাদের যাতায়াত অনেক সুবিধা হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে এই স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তলানিতে এসে ঠেকে। ২০১৮সালে মালবিকাদেবী অবসর নেন। তখন ছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ছ’জন। দু’জন শিক্ষিকা অন্যত্র বদলি হয়ে যান। তারপরও পড়ুয়াশূন্য স্কুলে কয়েক বছর একজন শিক্ষিকা, একজন মেট্রন ও একজন শিক্ষাকর্মী আসতেন। ২০২১সালে শিক্ষিকা ও মেট্রন অন্যত্র বদলি হয়ে যান। শিক্ষাকর্মী এসআই অফিসে নিযুক্ত হন। তারপর থেকে স্কুলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফাঁকা জায়গায় স্কুলটি থাকায় ইট, দরজা, জানালা সহ অন্যান্য সম্পত্তি নিয়ে পালিয়েছে দুষ্কৃতীরা। রাতে নেশাগ্রস্তদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ।
এবিষয়ে শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ রাজবালাদেবী বলেন, চারদিকে রয়েছে স্কুল। মেয়েরা সেখানে পড়াশোনা করতে চলে যাচ্ছে। ছাত্রী নেই, শিক্ষিকার অভাব সহ পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে স্কুলটি চলেনি। মাঝখানে একটি বেসরকারি সংস্থা শিক্ষা সংক্রান্ত কোনও ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। বিডিও শুভাশিস ঘোষ বলেন, আমরা বিষয়টি জানি। নানা সমস্যার কারণে স্কুলটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গ্রামবাসীরা নতুন করে দাবি পেশ করলে এনিয়ে কিছু করা যায় কিনা আলোচনা করে দেখব।