তাপস প্রামাণিক ও প্রদীপ চক্রবর্তী
হুগলি নদী জলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়াতে বলাগড়ে প্রায় ১০০ একর জমির উপরে অত্যাধুনিক মানের বার্জ টার্মিনাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দিনে পণ্যবাহী বার্ড ও ছোট জাহাজ হুগলি নদী দিয়ে সোজা পৌঁছে যাবে বলাগড় টার্মিনালে। সেখান থেকে কিছুটা পথ পেরিয়ে জাতীয় সড়ক ধরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাবে পণ্যবাহী গাড়ি। বন্দরের কর্তারা জানাচ্ছেন, এর ফলে একদিকে যেমন কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের উপরে চাপ কিছুটা লাঘব হবে, তেমনি কলকাতা ও হাওড়ার রাস্তায় পণ্যবাহী লরি ও ট্রাকের দাপট কমবে। সেই সঙ্গে কমবে পণ্য পরিবহণের খরচ।
বলাগড়ে বার্জ টার্মিনাল পুরোদমে চালু হলে তার আশপাশে অনেক গুদামঘর, নতুন কল-করাখানা, হোটেল, বাজার গড়ে উঠবে। তাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বদলে যাবে এলাকার অর্থনীতি। কয়েক দিন আগেই হুগলির সিঙ্গুরের গোপালনগরে সভ্য করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অনেকে ভেবেছিলেন, সেই সভা থেকেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর ব্যাপারে কোনও বার্তা দিতে পারেন। সেই আশা পূরণ না হলেও একই মঞ্চ থেকে বলাগড়ে প্রস্তাবিত বার্জ টার্মিনালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছেন মোদী। তাকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন হুগলি জেলার মানুষ।
বন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, বলাগড়ে প্রস্তাবিত বার্জ টার্মিনাল থেকে বছরে মোট ২.৭ মিলিয়ন টন কার্গো ওঠানামা করবে। তার মধ্যে ১.৯ মিলিয়ন টন পণ্যবোঝাই কন্টেনার। বলাগড় টার্মিনাল দিয়ে মূলত কয়লা, ডাল, মটর এবং সারের মতো পণ্য আসা যাওয়া করবে। হুগলির যে নেভিগেশন চ্যানেল দিয়ে বলাগড়ে টার্মিনালে পৌঁছতে হবে, সেখানে জলের গভীরতা (ড্রাফট) প্রায় তিন মিটার। সেখানে তিন হাজার ডেড ওয়েট টন (ডিব্লুটি) বার্জ নোঙর করতে পারবে। বার্জ টার্মিনালের জন্য জমিরও কোনও অভাব নেই এখানে। শুধু বলাগড় দ্বীপেই প্রায় ৯০০ একর জমি পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে বন্দরের হাতে রয়েছে ৩০৮.৭৫ একর জমি। বলাগড় বার্জ টার্মিনালকে ৬ নম্বর রাজ্য সড়ক তথা অসম লিঙ্ক রোডের সঙ্গে যুক্ত করতে তৈরি হবে নতুন রাস্তা। তার জন্য ইতিমধ্যেই টেন্ডার ডাকার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এছাড়াও বানানো হবে রোড ওভারব্রিজ। এর ফলে বড় বড় পণ্যবাহী লরি ও কন্টেনার সহজেই সেখানে যাওয়া-আসা করতে পারবে। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে, মোট দু'টি পর্যায়ে পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) মডেলে এই প্রকল্প রূপায়িত হবে। সবমিলিয়ে খরচ হবে আনুমানিক ৪৯৯ কোটি টাকা। রোড ওভারব্রিজ বানানোর জন্য আরও প্রায় ৩০-৩২ কোটি টাকা লাগবে। তার কিছুটা খরচ বহন করবে ইনল্যান্ড ওয়াটার ওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। টার্মিনালের জন্য বার্থ, কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, কার্গো রাখার জন্য স্টোরেজ স্থাপন ইত্যাদি পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বেরকারি সংস্থাকেই বিনিয়োগ করতে হবে। সেই সংস্থা বাছাইয়ের জন্য খুব শিগগির টেন্ডার ডাকা হবে।
হুগলির বিজেপি নেতা তথা দলের রাজ্য সম্পাদক স্বপন পাল বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী কেন সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপনের বার্তা দেননি, তা নিয়ে মিডিয়ায় বেশি হইচই হচ্ছে, কিন্তু বলাগড়ের বার্জ টার্মিনাল নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না। বলাগড়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে বার্জ টার্মিনাল বানাচ্ছে, তাতে গোটা হুগলি জেলার অর্থনীতি বদলে যাবে। প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা হলে যা না লোক কাজ পেত, তার থেকেও এখানে বেশি লোক কাজ পাবেন।' রাজ্যের পরিবহণ মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, 'কেন্দ্রের সরকার গত ১১ বছর ধরে বাংলাকে বঞ্চনা করে আসছে। ভোট এলেই বিভিন্ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। এ বারেও তিনি সিঙ্গুর তথা রাজ্যবাসীকে হতাশ করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের সভা থেকে উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরবেন।'
রাজ্যের কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী তথা হুগলির তৃণমূল নেতা বেচারাম মান্নার কটাক্ষ, 'বাংলায় ভোট এলেই বিজেপি লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেটা কোনও দিনই আলোর মুখ দেখে না। কলকাতা বন্দরই ঠিকমতো চলছে না, আর বলাগড়ে কী হবে, সে তো ভবিষ্যতের ব্যাপার। আগে হোক, তারপরে দেখা যাবে।'