• বাঘের রক্তস্নান? নাকি প্রকৃতির বর্মে সাক্ষাৎ ভ্রান্তিবিলাস! বান্ধবগড়ের বিস্ময়
    এই সময় | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • শিলাদিত্য সাহা

    ইতিহাস বলে, আনুমানিক ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গের যুদ্ধে মৃত সৈনিকদের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল দয়া নদীর জল। সেই ‘রক্তনদী’ দেখার পরেই মৌর্য সম্রাট অশোক হিংসার পথ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে ‘চণ্ডাশোক’ পরিণত হন ‘ধর্মাশোকে’। কিন্তু সে তো প্রাচীন কলিঙ্গের (অধুনা ওডিশা ও অন্ধ্রের কিছু অংশ) কথা। সেখান থেকে সহস্র যোজন দূরে মধ্যপ্রদেশের বান্ধবগড়ে (Bandhavgarh National Park) এত শতাব্দী পেরিয়ে কী ভাবে বইছে রক্তনদীর ধারা? কাদের রক্তে লাল হচ্ছে জঙ্গলের জলাশয়?

    ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার জয়ন্ত শর্মার (Jayanth Sharma) তোলা সাম্প্রতিক একটি ছবি সেই প্রশ্নই তুলছে বার বার। কয়েক সপ্তাহ আগে বান্ধবগড় টাইগার রিজা়র্ভের (Bandhavgarh Tiger Reserve) তালা জ়োনের একটি জলাশয় বা ওয়াটারহোলের সামনে বাঘের ছবি তুলেছিলেন জয়ন্ত। দেখা যাচ্ছে, শুকনো মাটির উপরে দাঁড়িয়ে একটি বাঘ, আর পিছনে জলাশয়টি টকটকে লাল। ঠিক যেন রক্তে ভরে গিয়েছে সেই ওয়াটারহোল। তবে কি বাঘটিই কোনও শিকার করেছে সেখানে, যার রক্তে লাল হয়েছে জলাশয়? আসল ঘটনা কিন্তু তা নয়। তাতে হিংসা তো নেই, বরং লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির আশ্চর্য এক রক্ষাকবচের গল্প।

    টকটকে রক্ত–লাল সেই ওয়াটারহোলের সামনে হলদে–কালো ডোরাকাটার ছবিটি তুলতে জয়ন্তকে অপেক্ষা করতে হয়েছে পাক্কা কুড়ি বছর! হ্যাঁ, দু’দশক। তাঁর কথায়, ‘২০০৬–০৭ সালে প্রথমবার যখন বান্ধবগড়ের জঙ্গলে গিয়েছিলাম, তালা জ়োনের এই জলাশয়কে (স্থানীয়রা বলেন গোপালপুর তালাও) চোখের সামনে সবুজ থেকে লাল হতে দেখেছি। গনগনে সূর্যের আঁচে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, আহা এখন যদি এটার সামনে একটা বাঘ আসত! তার পরে অজস্রবার বান্ধবগড়ে এসেছি। জলাশয় লাল হয়েছে, বাঘ আসেনি। রাজস্থানের রণথম্ভোর টাইগার রিজ়ার্ভের জ়োন ৪–এও এমন একটা জলাশয় আছে, লোকে সুখি তালাও বলে। সেখানেও টকটকে লাল জলাশয়ে একটা বাঘের ছবি তোলার আশায় কত ঘুরেছি। শেষে বান্ধবগড়েই কুড়ি বছরের স্বপ্নপূরণ হলো!’

    সেই স্বপ্নপূরণের ছবির সঙ্গেই আলোচনায় চলে আসছে প্রকৃতির সেই রক্ষাকবচের গল্প। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, আসলে কারও রক্তেই লাল হয়নি বান্ধবগড় বা রণথম্ভোরের ওয়াটারহোল। সেখানে রয়েছে একটি বিশেষ প্রজাতির শৈবাল (অ্যালগি) যা রোদের তেজ বাড়লে সবুজ থেকে লাল হয়ে যায়। জলে যে ভাবে শ্যাওলার আস্তরণ পড়ে, কতটা তেমনই ‘রোডোফাইটা’ প্রজাতির এই বিশেষ শৈবাল ভাসে জলের উপরে। গভীরে থাকে তার শিকড়।

    মূলত ‘মেমব্রানোপটেরা প্ল্যাটিফিলা’ এবং ‘ব্রাঞ্চড রেড’ — এই দু’রকমের শৈবালের দেখা মেলে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এমনিতে রোদ না–থাকলে বা অল্প থাকলে এমন শৈবাল সবুজই থাকে। কিন্তু রোদের তেজ যথেষ্ট বেড়ে গেলে এই শৈবালকে রক্ষার জন্য তার শরীরের উপরের স্তরে বিশেষ প্রোটিন নিঃসরণ হয় যা এক রকমের ‘পিগমেন্টেশন’ বা রং বদলের মাধ্যমে অস্থায়ী বর্ম তৈরি করে। ওই বর্ম সূর্যের প্রখর রোদ থেকে শৈবালের কোষগুলোকে বাঁচায়। সূর্যের তেজ কমে গেলে আবার সেই ‘রোডোফাইটা’ বা লাল শৈবাল ফিরে যায় নিজের স্বাভাবিক সবুজ রঙে।

    মধ্যপ্রদেশে বাঘ সংরক্ষণের কাজে যুক্ত বিজ্ঞানী অনিরুদ্ধ মজুমদারের কথায়, ‘এ রাজ্যে বিভিন্ন জঙ্গলে বন্যপ্রাণীর বাসস্থানের উপরে গবেষণার সময়ে এই লাল শৈবাল প্রথম দেখি। এমন শৈবাল জলীয় জীববৈচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হার্ড গ্রাউন্ড বারাসিঙ্গা, সম্বর হরিণকে এই শৈবাল খেতেও দেখেছি। এই শৈবাল (Batrachospermum moniliforme) ‘ফ্রেশ ওয়াটার ইকোসিস্টেম’–এর পরিচায়ক। কানহা–বান্ধবগড়ের বাইরেও মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলায় এই শৈবাল আছে। শুরুর দিকে নীলাভ সবুজ থাকলেও পরের দিকে সম্পূর্ণ লাল হয়ে যায়। তখন জলাশয়কে পুরো লাল দেখায়।’ সেই কারণেই প্রখর রোদে লাল শৈবালে ভরা জলাশয়ের সামনে দাঁড়ালে আচমকা দৃষ্টিবিভ্রমে সেটাকে রক্ত মনে হতেই পারে।

    প্রশ্ন জাগতে পারে, এ দেশে কলিঙ্গ ়যুদ্ধ বা ১৮৩৮–এ দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধে রক্তে লাল হয়ে যাওয়া বাফেলো বা ‘ব্লাড’ রিভারের সঙ্গে কি এর কোনও সম্পর্ক আছে?আসলে নেই। প্রকৃতির বর্ম ধোঁকা দিয়েছে চর্মচক্ষুকে!

  • Link to this news (এই সময়)