• কেন দেড়শো পরজীবী পরাশ্রয়ী পতঙ্গের নাম সংগ্রহ করেছিলেন শংকর?
    এই সময় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • রাহুল দাশগুপ্ত, লেখক

    প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শংকর। পুরো নাম, মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাঁর রচনা ছুঁয়ে গিয়েছে অগণিত পাঠকের হৃদয়কে। শংকরের জন্ম অবিভক্ত ভারতের যশোর জেলার বনগ্রামে, ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় উকিল ছিলেন। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি অকালে চলে যান। শংকর তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। শংকরের মা অভয়ারানি বাবা চলে যাওয়ার পরে সংসারটাকে বাঁচান। কপর্দকশূন্য অবস্থায় আট ভাই–বোনকে নিয়ে আশ্চর্য সংগ্রাম শুরু করেন। মাকে এত কষ্ট করতে দেখেছেন বলেই বাঙালি মেয়েদের দুঃখের কথা বারবার এসেছে শংকরের নানা উপন্যাসে।

    একটা চাকরি জোগাড়ের জন্য শংকর একটা সময় পাগলের মতো পথে পথে ঘুরেছেন। কখনও পথের ফেরিওয়ালা, কখনও টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনও প্রাইভেট টিউশানি, কখনও শিক্ষকতা— কত রকম কাজই না করেছেন। ১৯৫১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার, নিঃসন্তান নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল-এর সঙ্গে শংকরের প্রথম দেখা হয়। স্টেনো–টাইপিস্টের চাকরি পেলেন সাহেবের অফিসে। এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা ‘কত অজানারে’ গৌরকিশোর ঘোষের উদ্যোগে ১৯৫৪ সালে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই লেখার নাম দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রেমেন্দ্র মিত্র।

    শংকরের জীবনের সেরা কীর্তি তাঁর আত্মজীবনীমূলক ট্রিলজি, ‘কত অজানারে’, ‘চৌরঙ্গী’ এবং ‘ঘরের মধ্যে ঘর’। এই তিনটি উপন্যাসেই কেন্দ্রীয় চরিত্র, শংকর। ‘কত অজানারে’ (১৯৫৫) উপন্যাসে আইন পাড়ার মানুষের জীবনের নানা গল্প, বিভিন্ন কেসের ঘটনা উঠে এসেছে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয়, ‘চৌরঙ্গী’, শংকরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপন্যাস। মফসসলের ছেলে শংকর পঞ্চাশের দশকের চৌরঙ্গির হোটেল শাহজাহানে কাজ করতে এসে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার ও মানুষের পরিচয় পায়, তা নিয়েই এই আখ্যান।

    ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসে কপর্দকহীন, আশ্রয়হীন যুবক শংকর থ্যাকারে ম্যানসনের ম্যানেজার হিসাবে চাকরিতে যোগ দেয়, যার সূত্রে পুরোনো কলকাতার ইতিহাসের অনেকটাই উঠে এসেছে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় শংকরের উপন্যাস ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। এই বইটি লেখার সময় দেড়শো পরজীবী পরাশ্রয়ী পতঙ্গের নাম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। এ ভাবেই তাঁর প্রতিটি উপন্যাস লেখার পিছনে থাকত বিপুল পরিশ্রমের ইতিহাস।

    ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় শংকরের আর একটি বহুলপঠিত ট্রিলজি উপন্যাস, ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’। চাকরিভিত্তিক কর্মজীবনে যে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, তিনজন যুবকের চোখ দিয়ে তাই দেখিয়েছেন লেখক। এর মধ্যে দু’টি উপন্যাস, ‘জন অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ নিয়ে সিনেমা করেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। উপন্যাস ছাড়াও শ্রীরামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর অনেকগুলি বই আছে। তাঁর ভ্রমণ সাহিত্য খুবই জনপ্রিয়। এগুলির মধ্যে রয়েছে, ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’, ‘জানা দেশ অজানা কথা’, ‘মানবসাগর তীরে’ ইত্যাদি। নানা ধরনের স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন তিনি। এগুলির মধ্যে তিন খণ্ডে লেখা, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’ বোধহয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

    সারাজীবন কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় কাটালেও শেষ জীবনে শংকরের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। তিনি দীর্ঘায়ু ও স্বল্পাহারী ছিলেন। বিপুল পাঠক পেয়েছেন। কিন্তু কিছুটা নিঃসঙ্গতায়, প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে কেটেছে তাঁর শেষের কয়েকটা দিন। কিন্তু যখন উঠে বসেছেন, তখনও আড্ডা দিয়েছেন। অল্প সময়ের জন্য হলেও এসে বসেছেন বসবার ঘরে। মন খুলে কথা বলেছেন। প্রাণ খুলে হেসেছেন। নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করেছেন। কখনও বা স্মৃতির ভিতর ডুবে গিয়েছেন। বাঙালি জীবনের নানা দিক নিয়ে নিরন্তর ভেবে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন জীবনরসে নিমজ্জিত একজন মানুষ। তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল প্রাণশক্তি। সমকালের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল তুলনাহীন। তাঁর লেখায় এই দায়বদ্ধতাই বারবার প্রকাশ পেয়েছে। আয়ু ফুরিয়ে গেলেও, শংকরের লেখাতেও রয়েছে সেই অনিঃশেষ জীবনীশক্তি, যা কখনও ফুরোবার নয়...।
  • Link to this news (এই সময়)