• প্রয়াত শংকর, ‘চৌরঙ্গী’, ‘জন অরণ্য’-র স্রষ্টা পাড়ি দিলেন চিরঘুমের দেশে
    এই সময় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এ যেন এক যুগের অবসান। প্রয়াত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। শুক্রবার বেলা ১.১২ নাগাদ প্রয়াত হন সাহিত্যিক। বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। ব্রেন টিউমারে ভুগছিলেন। সাহিত্যিকের প্রয়াণে শোকের ছায়া সাহিত্যমহলে। শোকার্ত তাঁর অনুরাগীরাও। বেশ কিছু দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন সাহিত্যিক। গত বছর ডিসেম্বর পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল মণিশংকরের। সেই সময়ে তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিল হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। সাহিত্যিকের চিকিৎসক ডা. সুদীপ্ত মিত্র বলেন, 'কয়েকদিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ মাসের ৪ তারিখ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।'

    সাহিত্যিকের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 'এক্স হ্যান্ডলে' শোকপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, 'বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণি শঙ্কর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। 'চৌরঙ্গী' থেকে 'কত অজানারে', 'সীমাবদ্ধ' থেকে 'জনঅরণ্য'—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।'

    ১৯৩৩-এর ৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোহরের বনগ্রামে জন্ম শংকরের। বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন আইনজীবী। শংকরের ছোটবেলা কেটেছে হাওড়ায়। জীবনের শুরুতে কখনও শিক্ষকতা, কখনও হাইকোর্ট পাড়ায় কাজ করলেও লেখালেখির প্রতি গোড়া থেকেই অনুরক্ত তিনি।

    ১৯৫৫ সালে ‘কত অজানারে’ দিয়ে তাঁর সাহিত্যের সরণিতে পথ চলা শুরু। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের জনপ্রিয়তা তাঁকে পাঠক সমাজের চোখের মণি করে তোলে। তাঁর দু’টি উপন্যাস, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন-অরণ্য’ চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে সত্যজিতের হাতে। এই দু’টি উপন্যাস এবং ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর ট্রিলজি, স্বর্গ মর্ত পাতাল। সত্তর-আশির দশকে যাঁদের বেড়ে ওঠা, তাঁরা সাক্ষী এই ট্রিলজির একের পর এক সংস্করণ কী ভাবে নিঃশেষিত হয়েছে।

    কিশোর সাহিত্যে শংকরের প্রথম পদার্পণ শারদীয়া আনন্দমেলা-তে ‘পিকলুর কলকাতাভ্রমণ’ নামক অণু-উপন্যাসটি দিয়ে। পরে আবার এই লেখাটির নাম পাল্টে হয় ‘খারাপ লোকের খপ্পরে’। এর সঙ্গে আরও দু’টি লেখা নিয়ে 'এক ব্যাগ শংকর' নামে প্রকাশিত হয়। আবারও তুমুল জনপ্রিয়তা। 'নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি' 'বোধোদয়', 'এক দুই তিন', 'সার্থক জনম'- 'চরণ ছুঁয়ে যাই'-এর মতো কালজয়ী সাহিত্য তাঁর হাতেই সৃষ্ট। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি পান সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার। প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে তিনি ছিলেন, আছেন এবং রয়ে যাবেন..... আজীবন।
  • Link to this news (এই সময়)