• হাঁস কিন্তু ‘পাতি’ নয়, মারাত্মক ব্যাক্টিরিয়ার আস্তানা তার পেটে
    এই সময় | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে উঠোন থেকে সার বেঁধে প্যাঁক-প্যাঁক করে চলেছে হাঁসের সারি। পাড়া-গাঁয়ের এ ছবি খুবই নয়নাভিরাম। কিন্তু জানেন কি, গ্রামীণ জনসমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই সুস্থ ও নিরীহ পাতিহাঁস বাদুড়ের মতোই শরীরে বয়ে বেড়ায় ভয়ঙ্কর সব জীবাণু? শুধু তা-ই নয়, জীবাণুগুলির মধ্যে মারাত্মক আগ্রাসী ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ‘সালমোনেলা ব্যাক্টিরিয়া’কে পরিবেশে ছড়িয়েও দিতে পারে সে। যা মাংস ও ডিমের মাধ্যমে নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে। বেলগাছিয়ার রাজ্য প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির লাইপজি়গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স অফ মাইক্রোবায়োলজি’ নামে আন্তর্জাতিক জার্নালে।

    তবে হ্যাঁ, এই গবেষণা হাঁসের খামার তৈরিতে বা এর ডিম-মাংসের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে গবেষকদের আশ্বাস। দরকার হলো হাঁসের খামারিদের সচেতন করা। পরিচ্ছন্নতা ও জৈব-সুরক্ষাভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচারও বাড়াতে হবে দরকার। এ বাদে মাংস ও ডিম ধোয়ার পরে সাবান দিয়ে ভালো ভাবে হাত ধোওয়া এবং ‘ফুল বয়েলড’ ডিম খাওয়া ও ভালো করে কষিয়ে মাংস রান্নায় জোর দিচ্ছেন তাঁরা।

    রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি দপ্তরের অর্থসাহায্যে ওই গবেষণা হয়েছে। সেখানে হাঁস পালনের ক্ষেত্রে সতর্কতায় জোর দিয়ে জানানো হয়েছে, তা না হলে মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য গৃহপালিত পশুরও বিপদ বাড়বে। বছর দুয়েক আগে ওই গবেষক দলের রিসার্চেই জানা যায়, আপাত নিরীহ হাঁস নীরব ঘাতক বা সাইলেন্ট কিলার হয়ে উঠতে পারে, তেমন উপাদান তার মধ্যে রয়েছে। সালমোনেলা, ক্লেবসিয়েলা, সিউডোমোনাস এবং ই-কোলাই গোত্রের ব্যাক্টিরিয়া যে সুস্থ হাঁসের শরীরে বসবাস করে, সেটা ২০২৪-এর মাঝামাঝি ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ অ্যানিম্যাল রিসার্চ’ নামে বিজ্ঞানপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ বার জানা গেল, ওই সালমোনেলা আদতে মারাত্মক রোগের জন্ম দিতে সক্ষম (ভিরুলেন্ট) এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।

    গবেষণায় উঠে এসেছে, হাঁসের অন্ত্রে স্বাভাবিক ভাবে বসবাসকারী সালমোনেলার মধ্যে ভিরুলেন্ট বায়োফিল্ম তৈরির ক্ষমতাসম্পন্ন জিনও রয়েছে, যা নিঃশব্দে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে ব্যাক্টিরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী গুণকে বাড়িয়ে দিতে পারে। যা সরাসরি মানুষ ও প্রাণীর চিকিৎসায় প্রভাব ফেলতে পারে। সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক এ ক্ষেত্রে কাজ করে না। ফলে সংক্রমণ তো চট করে সারেই না, এমনকী প্রাণঘাতী পর্যন্ত হতে পারে। সে কারণেই সতর্কতা প্রয়োজন।

    প্রকল্পে যুক্ত গবেষক আদিত্য পাল বলেন, ‘দেশি পাতিহাঁস, খাঁকি ক্যাম্ববেল ও পেকিন প্রজাতির সুস্থ হাঁসে ক্ষতিকর সালমোনেলার ৪২ শতাংশের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজি়স্ট্যান্ট জিন পেয়েছি আমরা।’ তিনি জানান, উদ্বেগের মূল কারণ হলো, সাধারণত গ্রাম-বাংলার এই হাঁসগুলির শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয় না। ফলে মুড়িমুড়কির মতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কিংবা আন্ডার-ডোজ়ের কারণে রেজ়িস্ট্যান্স তৈরির আশঙ্কা নেই। বোঝা যা, এদের চারপাশের পরিবেশ থেকে, যেমন জলাশয়, খাবার ও বাসস্থান থেকে এরা এই রেজ়িস্ট্যান্স পেয়েছে। কিংবা এদের শরীরে জিন মিউটেশনের জন্য তৈরি হয়েছে এমন ব্যাক্টিরিয়া। যে কারণে পাতিহাঁসের ডিম ও মাংসের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে এই মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাক্টিরিয়া ঢুকে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সম্ভবত তা ঢুকেও পড়ছে নিঃশব্দে।

    আর এক গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির প্রধান শিক্ষক-চিকিৎসক ইন্দ্রনীল সামন্ত বলেন, ‘গবাদি প্রাণী, শুয়োর, কুকুর-বেড়াল, মুরগিতেও এ ধরনের জীবাণু আগে দেখেছি আমরা। কিন্তু বাংলার আপাতসুস্থ হাঁসও যে এই জীবাণু বহন করছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজ়িস্ট্যান্স তৈরিতে মদত দিচ্ছে, সেটা আগে জানা ছিল না।’

    রিসার্চের ‘প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর’, প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগেরই আর এক শিক্ষক-চিকিৎসক সিদ্ধার্থ জোয়ারদার বলেন, ‘আমরা প্রথম এই বিপদের কথা গবেষণাপত্রে রিপোর্ট করেছি। পাশাপাশি, মারাত্মক জীবাণুটিকে কী ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব, তারও দিশা দেখিয়েছি।’ সালমোনেলার ৬৯ ও ৩৫ কিলো-ডাল্টন প্রোটিন দু’টিকে ‘ডায়াগনস্টিক মার্কার’ হিসেবে দেখানো হয়েছে ওই পেপারে। কোন হাঁসের শরীরে ওই রেজি়স্ট্যান্ট ব্যাক্টিরিয়া রয়েছে, এর ব্যবহারে সেটাই আগাম বোঝা সম্ভব। এরই সঙ্গে অবশ্য ব্যবসায় প্রভাব না–পড়ার আশ্বাস এবং ডিম–মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা বলছেন তিনি।

    গবেষক দলের সদস্য, জার্মানির লাইপজ়িগের বিজ্ঞানী আহমেদ ওয়াহেদ বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক রেজি়স্ট্যান্সের একটা নীরব অতিমারী চলছে। জার্মানিও তার ব্যতিক্রম নয়। ভবিষ্যতে এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ বিষয়ে আরও যৌথ গবেষণামূলক প্রকল্পে কাজ করবেন।’

  • Link to this news (এই সময়)