• বাংলা এবং তামিলনাড়ু থেকে লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার ৮
    এই সময় | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: বাংলা এবং তামিলনাড়ু থেকে লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গি সন্দেহে ৮ জন জনকে গ্রেপ্তার করল দিল্লি পুলিশ। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এ রাজ্য থেকে আরও দু’জনকে পাকড়াও করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। লস্কর জঙ্গি সন্দেহে মালদা থেকে গ্রেপ্তার দু’জনের নাম উমর ফারুক এবং রবিউল ইসলাম। আর মুর্শিদাবাদ থেকে গুপ্তচর সন্দেহে ধৃতেরা হলেন জুহাব শেখ এবং সুমন শেখ। তামিলনাড়ু থেকে দিল্লি পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন মিজানুর রহমান, মহম্মদ শাবাত, উমর, মহম্মদ লিটন, মহম্মদ শাহিদ এবং মহম্মদ উজ্জ্বল। মালদা ও তামিলনাড়ু থেকে ধৃতদের মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। মুর্শিদাবাদ থেকে ধৃত জুহাব এবং সুমনের বিরুদ্ধে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর আওতায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ফলে এঁরাও বাংলাদেশি নাগরিক বলেই মনে করা হচ্ছে। দিল্লি-সহ দেশের নানা প্রান্তে পাকিস্তানি জঙ্গিরা হামলার পরিকল্পনা করেছে বলে খবর এসেছিল গোয়েন্দাদের কাছে। নির্দিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একের পর এক গ্রেপ্তারি করে দিল্লি পুলিশ।

    দিল্লিতে নতুন করে নাশকতার ছক সাজিয়েছে জঙ্গিরা — দিনেকয়েক আগে এই খবর পান গোয়েন্দারা। চাঁদনি চক এলাকায় একটি মন্দির-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লস্কর জঙ্গিরা আইইডি বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করেছে বলে জানতে পারেন গোয়েন্দারা। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির বিভিন্ন মেট্রো স্টেশন-সহ ১০টিরও বেশি জায়গায় কাশ্মীর নিয়ে বেশ কিছু পোস্টার নজরে আসে। তাতে ‘ফ্রি কাশ্মীর’, ‘স্টপ জেনোসাইড ইন কাশ্মীর’-এর মতো বার্তা দেওয়া ছিল। তদন্তভার যায় দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের হাতে। কয়েক জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই দিল্লি পুলিশের হাতে আসে মালদা-যোগ। উমর ফারুক এবং রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পরে তাঁদের মোবাইলের সূত্র ধরে মেলে তামিলনাড়ুর বাকি ছ’জনের খোঁজ। সেখানকার তিরুপ্পুর জেলার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ করছিলেন এঁরা। উথুকুলি এলাকা থেকে দু’জন, পাল্লাডাম এলাকা থেকে তিন জন এবং তিরুমুরুগানপুন্ডি থেকে এক জনকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। আধার কার্ড-সহ জাল ভারতীয় নথি তৈরি করে সকলেই বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন। ধৃতদের থেকে ৮টি মোবাইল ফোন এবং ১৬টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

    দিল্লিতে যেমন পোস্টার, বাংলায় তেমন সিম কার্ডের সূত্র ধরে দুই সন্দেহভাজন গুপ্তচরের হদিশ পায় এসটিএফ। সূত্রের খবর, মূলত সিম কার্ড চক্রের একটি তদন্তে নেমে পাক-যোগ নজরে আসে তদন্তকারীদের। জানা গিয়েছে, সিম কার্ড কিনতে আসা ব্যক্তিদের আধার তথ্য এবং বায়োমেট্রিক ব্যবহার করে একাধিক জাল সিম তুলতেন জুহাব এবং সুমন। (দু’জনেরই সিম কার্ড বিক্রির ব্যবসা ছিল। সুমন ব্যবসার পাশাপাশি একটি আলমারির দোকানে কাজও করতেন)। সেই সিম ব্যবহার করে খোলা হতো একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট। তদন্তকারীদের বক্তব্য, এই হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ে যে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) আসে, তা সরাসরি পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতেন দু’জন। ফলে এগুলির নিয়ন্ত্রণ সব পাকিস্তান থেকে হতো। এ কাজের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুহাব এবং সুমনের কাছে ‘ইনাম’ পৌঁছত বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা। গত ১০ তারিখ জুহাবকে মুর্শিদাবাদ থানার তেঁতুলিয়া পঞ্চায়েতের গুধিয়া গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জেরা করে মেলে সুমনের নাম। শনিবার গভীর রাতে সুমনকেও ওই একই গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে এই অভিযানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের থেকে নির্দিষ্ট ইনপুট এসটিএফ-এর কাছে এসেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এ দিনই মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের এক অফিসার বলেন, ‘এসটিএফ নিজেরা কোনও অভিযান চালালে জেলা পুলিশকে জানায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার থেকে ইনপুট পেয়ে কোনও অভিযান চালালে আমাদের সঙ্গে তেমন তথ্য শেয়ার করে না। এ ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

    এই গ্রেপ্তারির পরেই পরিষ্কার হয়েছে জঙ্গিদের মডিউল, যা নানা পথ ঘুরে সরাসরি যাচ্ছে রাওয়ালপিন্ডি — পাক সেনার হেডকোয়ার্টার্সের দিকে! গোয়েন্দাদের দাবি, পাক সেনার একেবারে শীর্ষস্তরের নেতৃত্বে এই অপারেশন সাজানো হয়েছে আইএসআই-এর সাহায্যে। এতে লস্করের মতো যেমন পাক জঙ্গি সংগঠনের ভূমিকা রয়েছে, তেমনই বাংলাদেশের একটি জঙ্গি সংগঠনও রীতিমতো সক্রিয় হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবর। জানা গিয়েছে, এই মডিউলের শিকড় পাকিস্তানের হলেও, পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল বাংলাদেশ থেকে।

    গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই ৮ জনের হ্যান্ডলার হলেন লস্করের অন্যতম শীর্ষ কম্যান্ডার সাব্বির আহমেদ লোন, যিনি বাংলাদেশ থেকে পুরো অপারেশনের তদারকি করছিলেন। গোয়েন্দারা জেনেছেন, আদতে কাশ্মীরের বাসিন্দা এই সাব্বির লস্কর-প্রধান হাফিজ় মহম্মদ সইদের খাস লোক বলে পরিচিত। এ-ও জানা গিয়েছে, এই পরিকল্পনার পুরোটাই সাজানো হয়েছে পাক সেনার সর্বাধিনায়ক আসিম মুনিরের তত্ত্বাবধানে। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, সম্প্রতি ইসলামাবাদের আত্মঘাতী বিস্ফোরণকে সামনে রেখে ফের ভারত-বিরোধী জিগির তুলতে মরিয়া মুনির। সে কারণেই আইএসআই এবং জঙ্গিদের নিয়ে নতুন করে ভারতে নাশকতা চালানোর এই পরিকল্পনা।

    গোয়েন্দা সূত্রের খবর, বাংলাদেশে বসে ভারতে নাশকতার এই নতুন ছকের পুরোটা আবর্তিত হচ্ছিল সাব্বির আহমেদ লোনকে ঘিরে, যিনি বাংলাদেশ থেকে নিয়ন্ত্রকের কাজ চালাচ্ছিলেন। জম্মু-কাশ্মীরের গান্দেরবালের কাঙ্গান গ্রামের এই সাব্বিরকে ২০০৭-এ দিল্লির চাঁদনি চক থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর থেকে একটি একে ৪৭, একটি ৯ এমএম পিস্তল এবং গ্রেনেড উদ্ধার হয়। পুলিশের বক্তব্য ছিল, কোনও হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার টার্গেট নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলেন সাব্বির। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ২০১৭-য় তিনি মুক্তি পান। এর পরেই সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান পাকিস্তানে। খুব দ্রুত হয়ে ওঠেন লস্কর শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন। সেখান থেকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় বাংলাদেশে।

    গোয়েন্দাদের প্রাথমিক ধারণা, শুধু নাশকতাই নয়, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ‘সেলফ সাসটেইন্ড’ বা স্বনির্ভর ইউনিট খোলা ছিল সাব্বিরের অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, অস্ত্র বা অন্য কোনও প্রয়োজনে বাইরের শক্তির উপরে নির্ভরশীল হবে না, এমন ইউনিট। ধৃতদের জেরা করে এই মডিউলের আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।

  • Link to this news (এই সময়)