• প্রতীক উর ভাবনার বাইরে, সিপিএমেই আস্থা রাখছেন তরুণ কর্মীরা
    এই সময় | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • এই সময়: কেউ বলছেন, 'ক্লোজড চ্যাপ্টার'। কেউ বলছেন, 'শূন্যতা কিন্তু তৈরি হয়ে থাকলেও তা সাময়িক।' প্রতীক উর রহমানের (Pratik Ur Rahaman) সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পদক্ষেপ সম্পর্কে এ ভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন বিভিন্ন জেলার বামপন্থী আন্দোলনের নানা অবের কর্মীরা। তাঁদের কথায় উঠে এল, ভোটের মুখে প্রতীকউরের দলত্যাগ সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের দুই সংগঠন এসএফআই ও ডিওয়াইএফআইয়ের কর্মীদের মধ্যে দোলাচল তৈরি করতে পারেনি।

    পাশাপাশি যে দলে তিনি গিয়েছেন, সেই তৃণমূলের কর্মীরা এর নেপথ্যে শাসকদলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃতিত্বকে বড় করে দেখছেন।

    এসএফআইয়ের বাঁকুড়া জেলা সভাপতি অনির্বাণ গোস্বামী বলেছেন, 'প্রতীকিউর রহমান আমাদের কাছে এখন ক্লোজড চ্যাপ্টার। সুদীপ্ত, সাইফুদ্দিন, স্বপন, মইদুলদের খুনিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ও।' সংগঠনে কাজ করার সুবাদে দীর্ঘদিন প্রতীকিউরকে কাছ থেকে দেখেছেন এসএফআইয়ের রাজ্য সহ-সভাপতি পুরুলিয়ার সুব্রত মাহাতো। বললেন, 'খারাপ লাগছে। গেল সেই শিবিরে, যাকে মানুষ দুর্নীতির আঁতুড়ঘর বলেই জানেন। আমাদের লড়াই ভোটে সাফল্য না-পেলেও লড়াইটা তো মিথ্যে হয়ে যায় না।' জেলার বাম যুবকর্মীরা জোর গলাতেই জানালেন, কেউ সরে গেলে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়, কিন্তু সোটা খুবই সাময়িক।

    এসএফআইয়ের পূর্ব পূর্ব বর্তমান জেলা সম্পাদক উষসী রায়চৌধুরী আবার মানছেন, ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার দরকার রয়েছে। তবে এই সঙ্গেই তিনি বলেছেন, 'আমরা যারা ছাত্র আন্দোলন করি, তাদের এই বিষয়টি খুব একটা ধাক্কা দিয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।'

    সিপিএমের ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের নেত্রী পৃথা তা রও বক্তব্য, 'আমরা তরুণ প্রজন্মের যারা বামপন্থায় বিশ্বাস করি, তাদের কাছে দল, দলের আদর্শই প্রথম ও শেষ কথা। সেখানে প্রতিকুরের থাকা বা না থাকাটা খুব বেশি ম্যাটার করছে না।' পূর্ব বর্ধমানেরই সমর্থক রাজেশ সাহারও একই কথা, 'প্রতীকউর নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।' এসএফআইয়ের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি কৌশিক সরকার প্রত্যয়ী নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। বলেছেন, এখন যারা এসএফআই করছে, তারা অন্য ধরনের চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া কেউ কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করে না।'

    জেলার পূর্ব বর্ধমানের কালনা-কাটোয়ার বাম রাজনীতির নতুন প্রজন্মও প্রতীকউরকে নিয়ে ভাবলেশহীন। কালনা শহরের ডিওয়াইএফ সভাপতি নেপাল সরকার বলেছেন, 'দলে এর কোনও প্রভাব পড়েনি।' কেতুগ্রামের তরুণ সিপিএম নেতা মিজানুল কবির বলেন, 'কেউ আদর্শচ্যুত হয়েছে বলে সিপিএমের কোনও ক্ষতি হবে না।' কাটোয়ার তরুন সিপিএম নেতা অয়ন গ্রামাণিকের সোজাসাপ্টা কথা, 'কমরেড প্রতীকউর এখন ক্লোজড চ্যাপ্টার।'

    পশ্চিম বর্ধমানেও চিত্র একই। ডিওয়াইএফআই-এর জেলা সভাপতি ভিক্টর আচার্য বলেছেন, 'ও যা বলেছে, সবই আইপ্যাকের শেখানো বুলি।' দলের যুবনেতা আবির ঘোষ বলেছেন, 'বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওর সাক্ষাৎকারে প্রমাণিত, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ও মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।' জামুড়িয়ার বাম যুব আন্দোলনের কর্মী বুদ্ধদেব রজকেরও বক্তব্য, 'নিজের সুবিধা বুঝে নিতেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে এই দলবদল।

    সালানপুর ব্লকের সিপিএমের যুবনেতা সৌরভ মুখার্জি জোরের সাঙ্গেই বলেছেন, 'একজন প্রতীকউর চালে গেলেও আরও অনেকেই আসছেন। দলের দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের যুবনেতা সিদ্ধার্থ বসুর একটাই কথা, 'যে প্রতীকউর শাসকদলের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলত, সে যখন সেই শাসকদলেরই পতাকা হাতে তুলে নেয়, তখন তা তার রাজনৈতিক অবক্ষয় ছাড়া আর কিছু নয়।' তবে প্রতীকউরের তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় নাম রাজনীতি কিছুটা হলেও দুর্বল হবে বলে মনে করেন ফরওয়ার্ড ব্লকের যুব সংগঠন খুব লিগের ফেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ রাজা আনসারি। অবশ্য এই সঙ্গেই তিনি বলেছেন, 'মানুষ বিক্রি হতে পারেন। বাম আদর্শ বিক্রি হয় না। এই অভাব ঠিকই পুরণ হয়ে যাবে।'

    অন্য দিকে, প্রতীকউরকে দলে পেয়ে খুশি তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের নেতা-কর্মীরা। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বাঁকুড়া জেলা সভাপতি তীর্থঙ্কর কুণ্ডু বলেছেন, 'প্রতীকটারের মতো তরুণ ও লড়াকু কর্মী যে কোনও দলেরই সম্পদ। তাঁকে স্বাগত।' ওই জেলার বড়জোড়া ব্লক তৃণমূল যুব সভাপতি সুখেন সিংহ বলেছেন, 'ও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। তাই তৃণমূলে যোগ দিয়েছে।'

    পূর্ব বর্ধমানের কালনা-২ ব্লকের তৃণমূল নেতা আমানত আলিও বললেন, 'নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করেছে, মমতা বন্দোপাধ্যায় ছাড়া কেউ উন্নয়ন করতে পারবেন না। তাই প্রতীকউর আমাদের দলে এসেছে।'

    ভোটের মুখে এক দল ছেড়ে শাসকদলে পা রাখা কি ঠিক, প্রশ্নের উত্তরে এই জেলার কাটোয়া অঞ্চলের তৃণমূলের তরুশ প্রজন্মের কর্মী দীপাঞ্জন সেনগুপ্ত, শুত্তম দাসরা বলেছেন, 'দলে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতা এলে ক্ষতি তো কিছু নেই। মানুষ বুঝতে পারছেন, তৃণমূলই একমাত্র বাংলাকে আগলে রাখতে পরে।'

    দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের তৃণমূলের তরুণ কর্মী বিপ্লব বিশ্বাস আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, 'প্রতীকউর তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় আমাদের দল আরও সমৃদ্ধ হলো।' অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই এর কান্ডারী বলে মনে করছেন তৃণমূলের নতুন প্রজন্মের নেতা-কর্মীরা। টিএমসিপি-র পশ্চিম বর্ধমানের জেলা সভাপতি অভিনব মুখোপাধ্যায় যেমন বললেন, 'রাজ্যের যুবদের আইকন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রতীকউরকে দলে নেওয়ায় তাঁর হাত মজবুত হয়েছে।' যুব তৃণমূলের জেলা সভাপতি পাখা দেওয়াসির কথায়, 'সিপিএম কোনও দিনই যুবদের প্রথম সারিতে তুলে আনেনি। আমাদের আইকন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তা করে দেখালেন। এটা আমাদের ও বিরোধী দলের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।'

  • Link to this news (এই সময়)