• রোটা ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগে চিকিৎসকরা
    আজকাল | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • গোপাল সাহা

    টিকাকরণের পরেও শিশুদের মধ্যে রোটাভাইরাস ডায়রিয়ার উপসর্গ বাড়তে থাকায় উদ্বেগ চিকিৎসক মহলে। কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিনে একাধিক শিশুর মধ্যে জ্বর, বমি ও তীব্র ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।

    চিকিৎসকদের দাবি, সদ্যোজাত থেকে ২–৩ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে। কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মিহির সরকার জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে বহু পরিবার শিশুদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসছেন। উপসর্গ হিসেবে দেখা যাচ্ছে পাতলা পায়খানা, পেটব্যথা, জ্বর, বমি, সর্দি-কাশি এবং খাওয়ার অনিচ্ছা।

    চিকিৎসকরা বলছেন, এই উপসর্গগুলি রোটাভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে বড় আকারের সংক্রমণের কোনও নিশ্চিত রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

    অন্যদিকে, বাইপাস সংলগ্ন এক বেসরকারি হাসপাতালে রোটাভাইরাসে আক্রান্ত দুই শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। ভর্তি করার সময় তাদের তীব্র ডায়রিয়া, বমি, জ্বর ও পেটব্যথার লক্ষণ ছিল।

    পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়ে। বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। আক্রান্ত দুই শিশুর একজনের বয়স ১১ মাস এবং অন্যজনের ৪ বছর; তারা গড়িয়া ও সোনারপুর এলাকার বাসিন্দা।

    হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, আরও অনেক শিশু একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। গুরুতর না হলে তাদের ভর্তি না করে ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে।

    কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিব্যেন্দু চৌধুরী জানান, ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদেরও হাসপাতালে আনা হচ্ছে। যাদের বেশিরভাগের মধ্যে পাতলা পায়খানা, পেটব্যথা ও খাওয়ায় অনীহা দেখা যাচ্ছে।

    বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আউটডোরেই চিকিৎসা হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে ভর্তি করতে হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের বেশি করে ওআরএস খাওয়ানো এবং শরীরে জলের অভাব ঠেকানোই সবচেয়ে জরুরি।

    চিকিৎসকরা জানান, রাজ্যে নিয়মিত রোটাভাইরাসের টিকাকরণ কর্মসূচি চলছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। অভিভাবকদের সচেতন থাকা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শিশুদের নিয়মিত ওআরএস দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

    কলকাতা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ইন্দ্রনীল বিশ্বাস বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কোন বিষয় নেই। সচেতন থাকতে হবে এবং শিশুদের ঘন ঘন ওআরএস খাওয়াতে হবে। মা ও বাবাদের শিশুদের প্রতি অবশ্যই নজর রাখতে হবে। কোনভাবে যাতে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় কিংবা বাথরুম করানোর সময় হাত পরিষ্কার থাকে।’

    বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকাল বা শীতের শেষে প্রতি বছরই শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা বাড়ে। মূলত নবজাতক থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের ঝুঁকি বেশি থাকে।

    রোটাভাইরাস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা মূলত গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস ঘটায়। এর ফলে ডায়রিয়া, বমি, জ্বর ও পেটব্যথায় আক্রান্ত হয় রোগী। এটি প্রধানত পায়ুদ্বার থেকে ছড়ায়।

    অর্থাৎ সংক্রমিত শিশুর মল থেকে দূষিত হাত, খেলনা, খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। এই রোগের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য জলের অভাব রোধ করা।

    পর্যাপ্ত তরল, ওআরএস এবং বিশ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ সেরে যায়। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দেন চিকিৎসকরা।

    টিকাকরণই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে টিকা নেওয়ার পরেও আক্রান্ত হলে সাধারণত রোগের তীব্রতা কম হয়।

    শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাকরণ সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সংক্রমণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

    চিকিৎসক সমাজের দাবি, সরকার ও প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হলে এই ভাইরাসের প্রকোপ আরও কমানো যাবে। শহর কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর আক্রান্তের বিষয় নিয়ে যথেষ্টই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তা দে।

    শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংযুক্তা দে বলেন, ‘এই ভাইরাসের প্রকোপ মূলত এক বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। আর এই ভাইরাসের আক্রান্তের কারণে কিডনি পর্যন্ত নষ্ট হয়ে মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণে বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগেই। সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা দেশের সরকার এই ভাইরাস নিয়ে প্রতিষেধক বা টিকাকরণ কাজ নিয়মিত করে যাচ্ছে। তারপরেও কিভাবে এই সংক্রমণ, তা যথেষ্টই চিন্তার বিষয়। এই প্রতিষেধক টিকাকরণের নিয়ম হচ্ছে, শিশুর জন্মানোর ছয় মাস থেকে ৮ মাস বয়সের মধ্যে তার তিনটি টিকা বা প্রতিষেধক সম্পূর্ণ করতে হয়।’
  • Link to this news (আজকাল)