• সিপিআইএম-এর অন্দরে ফিসফাস, সন্দেহ ক্রমে বাড়িতেছে!
    আজকাল | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • রিয়া পাত্র

    'কি অভিশপ্ত একটা জাত! সুতা-মজুর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। দেখাদেখি মাঝিরও একটা নিঃশ্বাস পড়ে'                                                                                                                                                                                                                                       (আদাব। সমরেশ বসু।)

    এই মুহূর্তটুকুর প্রেক্ষাপট অন্য। এই দু'জন মানুষের পরিস্থিতি, ঘটনা প্রবাহ অন্য। পৃথক যাবতীয় সমস্তটুকু। কিন্তু বর্তমানের বঙ্গের রাজনীতির যা পরিস্থিতি, তাতে অনায়াসে একদিকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যেতে  পারে পশ্চিমবঙ্গ সিপিআইএম-এর যে কোনও দু'জন নেতা-নেত্রীকে। ধরে নেওয়া যাক একদিকে সৃজন, একদিকে কাঁথির কোনও লাল পতাকার জন্য মার খাওয়া বছর ২৫-এর যুবক। একদিকে দাঁড়াতে পারেন দীপ্সিতা অন্যদিকে বাঁকুড়ার কোনও যুবতী, যে কলেজের গেটে কটুকথা শুনেছেন লাল পতাকা বয়ে নিয়ে যাওয়ার 'সাহস' দেখাচ্ছেন বলে।

    এই দু'পাশে দু'জনকে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটুকু কাল্পনিক বলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু পরিস্থিতি কাল্পনিক নয় একেবারেই। একেবারে স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলে দেওয়া যেতে পারে, এই মুহূর্তে বাংলার সিপিআইএম-এর নেতা নেত্রীরা, রাত বাড়লেই যেন ভরসা করতে পারছেন না একজন আর একজনকে। গোটা ঘটনার নেপথ্যে অবশ্যই তিরিশ পেরনো এক যুবক। যিনি তাঁর এক সিদ্ধান্তেই বুঝি বা গোটা দলের মধ্যে, সহযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র সন্দেহের বীজ বুনে দিতে  পেরেছেন। 

    তিরিশ পেরনো এই যুবক প্রতীক উর রহমান। দু'দশকের কম-বেশি কিছু সময়, কাঁধে লাল পতাকা বয়েছেন। 'লাল সেলাম কমরেড' বলেছেন। অতি সাধারণ জীবন যাপন, গাঁয়ের মেঠো গন্ধ, দলের প্রতি আকুণ্ঠ ভালবাসা, 'কিছুই চাই না আমি' সুলভ আবেদন দিয়ে, প্রতীক উর রাজ্য সিপিএম-এর ছোট-বড় সব নেতার মধ্যে এক গভীর বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছিলেন। সকলেই ভেবেছিলেন, প্রতীক উর আর লাল ঝান্ডা, একে অন্যের সঙ্গ ছাড়বে না কোনও দিন। বাম রাজনীতি, নেতাদের তথাকথিত 'পদস্খলন' দেখেনি, 'লোভ' দেখেনি, 'দলত্যাগ' এর মতো 'ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত' নিতে দেখেনি এমনটা নয়। তালিকা লম্বা। নৃপেন চক্রবর্তী থেকে সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুন্ড, অনুরাধা পুততুন্ডু থেকে খগেন মুর্মু, লক্ষ্মণ শেঠ, শঙ্কর ঘোষ কিংবা ঋতব্রত ব্যানার্জি। প্রত্যেকেই কোনও না কোনও কারণ দেখিয়েছেন এবং বেশিরভাগের কারণ মূলত দলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা। তাঁরা দলত্যাগ করার পর, বারবার যে কথাগুলো ক্ষোভের সঙ্গে, অভিমানের সঙ্গে তুলে এনেছেন, তা একটি গণতান্ত্রিক দলের জন্য খব একটা সুখকর অভিযোগ নয়। অভিযোগ মূলত, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা থেকে বিচ্যুতি। অভিযোগ সেটিং, লবিবাজি, কোণঠাসা করার মতো একাধিক বিষয় নিয়ে। 

    এসব নতুন নয়, পুরনো। কিন্তু শঙ্কর কিংবা ঋতব্রত হাজার হাজার কথা বলে দলত্যাগ করে যা করতে পারেননি, প্রতীক উর করতে পারলেন সেটাই। প্রতীক উর রহমান। ঘাম ঝরানো, খেটে খাওয়া প্রতীক উর, বন্ধু প্রতীক উর, দাদা প্রতীক উর, সহযোদ্ধা প্রতীক উর যখন সিপিএম-এর পতাকা ছেড়ে অভিষেক ব্যানার্জির হাত ধরে তৃণমূলের পতাকা তুলে নিলেন হাতে, তখন বুঝি আঘাত লাগল সকলের বুকে অনেক বেশি। প্রতীক উর তৃণমূলে যোগদানের পর, সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক বলছেন সন্তান হারানোর যন্ত্রণা, কেউ বলছেন বন্ধু বিচ্ছেদের শোকাতুর হওয়ার কথা। কেউ শেষ মুহূর্তেও ফোন করে বলতে চেয়েছেন, 'ভাই যাস না।' কেউ মানতে পারছেন না, কেউ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো অবস্থাতেই নেই। 

    তাহলে কি প্রতীক উর দল ছেড়ে, শুধুই অন্যদের বুকে ব্যথা দিয়ে, মনকেমন, পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে 'শত্রু' দলে গেলেন? পরিস্থিতি তেমনটা বলছে না। তাহলে পরিস্থিতি কী? প্রতীক উর সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসতেই, সিপিএম-এর অলিন্দে নাকি চলছে নাম মাপার কাজ। লাল পতাকার গায়ে এখন সন্দেহের শ্বাস। ফোনাফুনি। 'এ কি দল ছাড়ছে?', 'ও কি সত্যি প্রতীকের মতো করবে?',  'তোমার কাছে খবর আছে কোনও?',  'জানলে জানিও, মনটা ভাল নেই।'  প্রতীক উর যদি প্রতীক বদলে নিতে পারেন, তাহলে এরপর আর কে? বাম বৃত্তের মধ্যে গত কয়েকদিনে জোর জল্পনা।

     এসবের মাঝেই আবার দুম করে সামনে এসে গেল, দীপ্সিতা নাকি দলের সদস্যপদ নবীকরণ করাননি। কেউ বলছেন, দীপ্সিতা নাকি এবার রাজ্যসভার টিকিট চাইছেন তৃণমূলের কাছে। কেউ বলছেন দল ইচ্ছা করেই দীপ্সিতার বিপক্ষে দল নাকি মীনাক্ষীকে প্রস্তুত করছে ওই এলাকার জন্য। এই কোনও উড়ো খবরের কোনও নিশ্চয়তা কোনও পক্ষই নিজে থেকে জানায়নি। কিন্তু আচমকা বাইরে এসে গিয়েছে হুড়মুড়িয়ে, চেপে রাখা ছাইয়ের মতো। কিছুটা জল্পনা, কিছুটা আবার সত্যিও। জল্পনায় নাম জড়িয়েছে প্রতীক উর-এর এক সময়ের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সৃজনেরও। রাজ্যের একাধিক নানা জেলা কমিটি, এরিয়া কমিটিতে থমথমে মুখে ঘুরছে নানা প্রশ্ন। মাঝখান থেকে দল ছাড়ুন বা না ছাড়ুন বেকায়দায় পড়েছেন প্রতীক উর ঘনিষ্ঠ সৃজন, দীপ্সিতারা, একথা বলাই বাহুল্য। তাঁরা বলছেন, ইচ্ছাকৃত ম্যালাইন করা হচ্ছে। যদি তাই হয়, তাহলে ইচ্ছাকৃত এই ম্যালাইন করছেন কারা? দলের অভ্যন্তর থেকেই কি কেউ? তেমনটা না হলে, কেন তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন সংবাদ মাধ্যমের সামনে এসেছে বলতে, যে 'আমরা কোথাও যাচ্ছি না।', আমাদের 'হৃদয় দপ্তর পালটাচ্ছে না।' কেন এই সাফাই দিতে হচ্ছে? তারাও কি বুঝতে পারছেন, আগের মতো বিশ্বাসের সেই ভিত নেই আর?

    অন্যদিকে আরও লক্ষণীয় প্রতীক উর-এর কিছু মন্তব্য। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দল কেবল তাঁর সঙ্গেই ভুল করেনি, করেছে সৃজনের সঙ্গেও।। বঙ্গ রাজনীতি থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দিল্লিতে। এখানেই আবার খেলা ঘুরে গিয়েছে অন্যদিকে। প্রতীক উর যেই বন্ধুর হয়ে দরবারের ভঙ্গিতে দু' কথা বলেছেন, দলের ভিতরে স্পষ্ট হয়েছে আরও এক ধিকধিক করতে থাকা অশান্তি। দলের অন্দরে এখন এ নিয়েও নতুন বিতর্ক। কেউ কেউ বলছেন, সৃজন, দীপ্সিতা, ঐশীর মতো নেতা নেত্রীরা, আদতে সারা বছর মাঠে ময়দানে ঘাম ঝরাচ্ছেন না। রাজ্যে থাকছেনও না বড় একটা সময়। কিন্তু টিভি-মিডিয়া সাক্ষাৎকার-ডিগ্রিতে ভর করে, দল তাঁদের হাতে তুলে দিচ্ছে পদ, টিকিট। অভিযোগ যেমনটা, তাতে মনে হচ্ছে ইন্সটাগ্রাম ফলোয়ার বেশি দেখে অভিনয়ে সুযোগ দেওয়ার যে অভিযোগ ওঠে, সিপিএম-ও খানিকটা তাই করছে। অভিযোগ, এই 'নতুন মুখ' বলে যাদের তুলে আনার চেষ্টা করছে দল, তাঁদের সরাসরি শ্রেণি সংগ্রামের সঙ্গে যাপন করার কোনও উদাহরণ নেই।  তাতে আমরা-ওরা জাতীয় বিভেদ তৈরি হয়েছে, আলিমুদ্দিনের দরজায় কান পাতলে তা স্পষ্ট এক প্রকার। অন্যদিকে এই 'আমাদের মুখ' বলে এই সিপিআইএম-এর মধ্যে তৈরি হয়েছে, হচ্ছে, তাতে প্রশ্ন ওঠে আরও একটি বিষয় নিয়েও। কমিউনিস্ট পার্টির কিন্তু মুখ তৈরি হওয়ার কথা ছিল না। সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং-এর মতো করে 'নতুন মুখ'-এর যে উদ্দীপনা, চাহিদা তৈরি হল গত কয়েকবছরে, তা কি শাপে বর হয়ে গেল? প্রশ্ন উঠছে শ্রেণি সংগ্রাম থেকে সিপিআইএম পিছিয়ে গেল বলেই কি দলে এই 'মুখ'-এর বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে গেল? 

    অর্থাৎ, খুব স্পষ্ট করে যেটা বলা যায়, এই প্রতীক উর দল ছেড়ে, নিজে তো গেলেন অন্য দলে ঠিকই। কোথাও গিয়ে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত, তিনি সন্দেহের বীজ বুনে দিয়ে গেলেন সিপিএম-এর ভিতরে। বামেরা যদিও বলছেন, প্রতীকের প্রতীক বদলে দলের ক্ষতি হল না কোনও। কিন্তু হিসেব কিছুটা অন্য কথা বলছে এই বিষয়েও। এই রাজ্যের রাজনীতিতে বিজেপি-তৃণমূল বাইনারি কিছুটা ভাঙছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই তরুণ মুখেদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ভরসা পাচ্ছিলেন। ভোট বক্স ভরে না উঠলেও ব্রিগেড ভরছিল। ২৬-এর ভোট বামেদের জন্য একটা কঠিন লড়াই হতে পারত। প্রতীক উর দল ছেড়ে, লাগাতার  বিরুদ্ধে বিষোদগার করে কোথাও গিয়ে জল ঢাললেন সেই সম্ভাবনার উপরেই।

    অনেকে বলছেন, সিপিএম প্রতীক উর-এর মতো নেতাদের নীতি-নৈতিকতার পাঠ হয়তো দিতে পেরেছে। বিশ্বাস করাতে পারেনি। না দলকে। না নিজেদেরকে। না একে অন্যকে। 
  • Link to this news (আজকাল)