আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধর্ম বড়, না জন্মদাত্রী মা? সুশীলা মুর্মু প্রসঙ্গে মুখ খুললেন হ্যাম রেডিওর সম্পাদক।২২ বছর পর পরিবারের সন্ধান মিললেও ঘরে ফেরা হল না ৬২ বছরের সুশীলা মুর্মুর। এই ঘটনায় মানবিকতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
২০০৪ সালে বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর কলকাতায় এসে পৌঁছন সুশীলা। পরে তাঁকে একটি হোমে রাখা হয়। সেখান থেকেই যোগাযোগ করা হয় ওয়েস্ট বেঙ্গল হ্যাম রেডিও ক্লাব–এর সঙ্গে। হ্যাম রেডিও সদস্যদের প্রচেষ্টায় খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর বাড়ির ঠিকানা, বিহারের গদ্দা জেলার পরিয়াহাট থানার অন্তর্গত দাহুপদার মঙ্গুতল্লা গ্রামে।
ভিডিও কলে একমাত্র ছেলে মদন বেসরার সঙ্গে কথা হয় তাঁর। ছেলে মাকে চিনতে পারলেও ধর্মীয় কারণে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেন। প্রশ্ন ওঠে, জন্মদাত্রী মা বড়, না ধর্ম? ছেলের উত্তর, “ধর্ম।”
এই প্রসঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল হ্যাম রেডিওর সম্পাদক অম্বরিশ নাগ বিশ্বাস বলেন, “আমরা হ্যাম রেডিও কর্মীরা হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াকেই মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করি। প্রযুক্তি আমাদের মাধ্যম, কিন্তু লক্ষ্য একটাই— মানুষকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সুশীলা দেবীর ক্ষেত্রেও আমরা সেই কাজটাই করেছি। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। এই ঘটনায় আমরা ব্যথিত। কারণ, একজন মা ২২ বছর পর ছেলের মুখ দেখলেন, কিন্তু ঘরে ফিরতে পারলেন না, এটা নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক।”
তিনি আরও বলেন, “ধর্ম, জাতি বা পরিচয়, এগুলো ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু মানবিকতার ঊর্ধ্বে কিছুই হতে পারে না। আমরা আশা করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের মনোভাব বদলাবে এবং একদিন সুশীলা দেবী তাঁর নিজের ঘরে ফিরতে পারবেন।”
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি সমাজের মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন রয়ে যায়, সত্যিই কি মানবিকতাকে সর্বোচ্চ স্থানে রাখতে পারছেন সকলে?
হ্যাম রেডিওর সম্পাদক অম্বরিশনাথ বিশ্বাস জানান, কলকাতার একটি হোমে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নিয়ে আছেন ৬২ বছর বয়সী সুশীলা মুর্মু। তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গ অধ্যায়ের কথা জানতে পেরে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসেন হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। শুরু হয় তাঁর পরিবারের সন্ধান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিহারের গড্ডা জেলা-য় তাঁর একমাত্র ছেলে বসবাস করেন, যিনি বর্তমানে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বহুদিন পর ভিডিও কলের মাধ্যমে মা ও ছেলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। আবেগঘন সেই মুহূর্তে একদিকে যেমন ছিল দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের বেদনা, অন্যদিকে ছিল ঘরে ফেরার সম্ভাবনার ক্ষীণ আলো।
তবে সেই আশার আলো ম্লান হয়ে যায় ছেলের একটি শর্তে। জানা যায়, আগে মুর্মু পরিবার খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাঁরা হিন্দু ধর্ম পালন করেন। ছেলে তাঁর মাকে প্রশ্ন করেন, তিনি এখনও খ্রিস্টান ধর্ম পালন করছেন কি না। এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, হিন্দু ধর্ম গ্রহণ না করলে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
এই ঘটনার পর হ্যাম রেডিওর পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। অবিলম্বে পুলিশ প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে পুরো বিষয়টি জানানো হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকদেরও অবহিত করা হয়েছে। বৃদ্ধার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার্থে ছেলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।