• রক্তের দাগ মুছতে দেওয়ালে রং, টাওয়ার লোকেশনও ‘টুইস্ট’, বাবাকে হত্যার প্লট কী ভাবে সাজিয়েছিল অক্ষতপ্রতাপ?
    এই সময় | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ইচ্ছাকৃত অপরাধের চারটি অধ্যায় থাকে। প্রথমটিকে বলা হয় অপরাধের ইচ্ছা (ল্যাটিন ভাষায় Mens Rea), পরবর্তী অধ্যায় হলো অপরাধ সংগঠিত করার প্রস্তুতি, তৃতীয় ধাপে অপরাধ করার উদ্যোগ এবং শেষ ধাপে অপরাধ সংগঠিত করা। এই প্রতিটি ধাপ নিখুঁত ভাবে পার করেছে নিজের ব্যবসায়ী বাবা মানবেন্দ্র সিংকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে অক্ষতপ্রতাপ সিং। উত্তরপ্রদেশের লখনৌয়ের রোমহর্ষক ঘটনায় একাধিক তথ্য পাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

    ‘ঠান্ডা মাথার হত্যাকারী’ অপরাধ করেও থামে না। অপরাধের পরে তার প্রমাণ বা চিহ্ন মোছার প্রক্রিয়া শুরু করে। এ ক্ষেত্রেও অক্ষতপ্রতাপ তাই-ই করেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

    লখনউতে একাধিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদের দোকান রয়েছে মানবেন্দ্র সিংয়ের। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলে ব্যবসায় না এসে ডাক্তারি পড়ুক। NEET পরীক্ষার প্রস্তুতি নিক। বড় ডাক্তার হোক ছেলে। তবে অক্ষতপ্রতাপ চেয়েছিল, পারিবারিক ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। বাবা-ছেলের মধ্যে ‘শত্রুতা’র বীজ অঙ্কুরিত হয় ‘কেরিয়ার’ নিয়ে মতবিরোধ থেকেই। মানবেন্দ্রর মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও এই বিষয় নিয়ে দু’জনের তর্কাতর্কি হয় বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

    তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, বাবার সঙ্গে মতবিরোধের পরেই মাথায় রাগ চাপে অক্ষতের। পুলিশি জেরায় অক্ষত তদন্তকারীদের জানিয়েছে, হত্যার একদিন আগে একটি অনলাইন ডেলিভারি সংস্থা থেকে দু’টি ছুরি অর্ডার করে। এর পাশাপাশি বাজার থেকে একটি করাত এবং একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম কিনে রাখে অক্ষত।

    গত ২০ ফেব্রুয়ারি নিজের বাবাকে গুলি করে হত্যা করে অক্ষত। এর পরেই মৃতদেহ টুকরো টুকরো কাটতে শুরু করে সে। পুলিশের দাবি, জেরায় অভিযুক্ত কবুল করেছে সে ছুরি এবং করাত দিয়ে তার বাবার হাত ও পা কেটে ধড় থেকে আলাদা করে। দেহাংশ গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে ২১ কিলোমিটার দূরের একটি খালে ফেলে আসে।

    এর পরেই এক এক করে প্রমাণ মেটানোর কাজ শুরু করে অক্ষত। গুলি লাগায় মানবেন্দ্রর বিছানায় রক্তের ছিটে লাগে। বালিশেও রক্তের দাগ লাগে। সেই সব বস্তায় ভরে বাইরে নিয়ে যায় অক্ষত। স্থানীয় একটি খালের তীরে নিয়ে গিয়ে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘটনাস্থল থেকে আংশিক পোড়া কাপড় এবং ছাই উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা, যা ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

    তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গুলি চলায় ঘরের দেওয়ালের কিছু অংশে রক্তের ছিটে লেগে যায়। দাগ মুছতে দেওয়ালে রঙ করে দেওয়া হয়।

    বাবা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে বলে রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপরাধের পরে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে অক্ষত। সেই গ্রুপের নাম দেওয়া হয় ‘পাপা লওট আও’ (বাবা ফিরে এস)। সেখানে পরিবারের অনেককে যুক্ত করা হয়। সন্দেহ যাতে তার উপরে এসে না পড়ে, সেই কারণে নিজের বাবার ব্যবসায়িক সহযোগী, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ওই গ্রুপে কথাবার্তা চালানো হয়।

    এর পাশাপাশি অ্যালিবাই তৈরি করার জন্যে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে অক্ষত। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন রিপোর্ট দেখে পুলিশ সেই সব তথ্য জোগাড় করেছে। পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্যেই অক্ষতপ্রতাপ লোকেশন পরিবর্তন করে ছিল বলেই মনে করা হচ্ছে।

    পুলিশ কর্তা অভয়প্রতাপ মল জানিয়েছেন, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যে অক্ষতকে সেই ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীদের জেরায় বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে অক্ষত। তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সমস্ত তথ্য ঘেঁটে দেখার পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণ এককাট্টা করার পরেই চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।

    উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন লখনৌয়ের ‘বর্ধমান প্যাথলজি’-র মালিক মানবেন্দ্র প্রতাপ সিং। সন্দেহ হওয়ায় ছেলে অক্ষতপ্রতাপকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। টানা জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে নিজের বাবাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন নেয় সে।

  • Link to this news (এই সময়)