• ‘প্রথম হয়ে যে চাকরি হারাবো না, তার তো কোনও গ্যারান্টি নেই’, অতীতের ক্ষত এখনও দগদগে কৃষ্ণমৃত্তিকার
    এই সময় | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • নীলাঞ্জন দাস

    গোল্ড মেডেল পাওয়া মেয়ে। আদালতের একটা নির্দেশে চাকরি (SSC 2016) খুইয়েছিলেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের স্কুলের শিক্ষিকা কৃষ্ণমৃত্তিকা নাথ (Krishnamrittika Nath)। সে দিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এই মেয়ে। বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার, রাজ্যপাল সোনার পদক দিয়েছেন। এখন আমাকেও যদি প্রমাণ করতে হয় আমি যোগ্য নাকি অযোগ্য, কিছু বলার নেই।’ সত্যিই হয়ত সে দিন মৃত্তিকার কিছু বলার ছিল না। তবে আরও একবার পরীক্ষায় বসে, বলা ভালো অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করলেন, তিনি ‘যোগ্য’। ২০১৬ সালের পরীক্ষায় মিউজ়িক বিষয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন, এ বার প্রথম হয়েছেন।

    ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) নির্দেশে রাজ্যের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়। তালিকায় ছিলেন কৃষ্ণমৃত্তিকা নাথও। চাকরি হারিয়ে তাঁর সেই কান্নার ছবি দেখে চোখে জল এসেছিল অনেকেরই। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভাইরাল হয়েছিল কৃষ্ণমৃত্তিকার সেই ভিডিয়ো। এ বারও ভাইরাল তাঁর ভিডিয়ো। এ বারও চোখে জল, তবে সে জল বহু লড়াইয়ের পরে জয়ের জল। আবেগে-অভিমানে-ভালোলাগায় যে জল চাইলেও আটকানো যায় না।

    কৃষ্ণমৃত্তিকা নাথ ২০১৬ সালে মিউজ়িক নিয়ে SSC-তে দ্বিতীয় হন। পোস্টিং হয় দেবীনগর কৈলাসচন্দ্র রাধারানি বিদ্যাপীঠে। কিন্তু এর পরের ঘটনাক্রম সকলেরই জানা। রাতারাতি প্যানেল বাতিল, চাকরিহারা প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা। এর পরে আবারও পরীক্ষায় বসা, আবারও নিজেকে প্রমাণের লড়াই।

    মঙ্গলবার সুপারিশপত্র পেয়ে এ বার কৃষ্ণমৃত্তিকা উত্তর ২৪ পরগনার হাবরায় তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অশোকনগর এলাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন। তবে নিজেকে এ বার প্রমাণ করলেও পুরোনো ক্ষত ভুলতে পারছেন না কৃষ্ণমৃত্তিকা। তিনি বলেন, ‘বিষয়টা পুরোটাই বিচারাধীন। যাদের চাকরি হলো না, তাঁরা কি তা হলে অযোগ্য? এটাও তো ঠিক হলো না। বছরখানেক ধরে তো আমরা অনেক অপমান, অনেক অসম্মান সহ্য করেছি। স্কুলে, স্কুলের বাইরে সব জায়গাতেই, এমনকী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকেও অপমান সইতে হয়েছে। যাঁরা আমাদের যোগ্যতা নিয়ে আঙুল তুলেছিলেন, তাঁরা কোথাও না কোথাও গিয়ে সত্যি সজোরে থাপ্পড় খেয়েছে।’

    কৃষ্ণমৃত্তিকার সংযোজন, ‘আগের বার দ্বিতীয় হয়েও তো চাকরি হারিয়েছিলাম। এ বার প্রথম হয়ে যে চাকরি হারাবো না আবার, তার তো কোনও গ্যারান্টি নেই। বিষয়টি এখনও তো বিচারাধীন। হাইকোর্ট তো বলেই দিয়েছে, বিষয়টি নির্ভর করছে কোর্ট কেসের রায়ের উপরে।’

    আট বছর রায়গঞ্জে পড়িয়েছেন কৃষ্ণমৃত্তিকা। বহু স্মৃতি সেই স্কুল ঘিরে। মায়ায় বেঁধে ফেলেছিল সেই স্কুল। সে সব বাঁধন খুলে এ বার নতুন চাকরিস্থল। মন খারাপ কৃষ্ণমৃত্তিকার। তবে প্রথমবার পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়েও বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে দূরে পোস্টিং নিতে হয়। তাঁর দাবি, সে সময়ে কোনও রস্টার মানা হয়নি।

    কৃষ্ণমৃত্তিকার দাবি, আদালতেও তাঁদের কথা বলার সুযোগ ছিল না। তাঁরা কী চান, কেউ বলতেই দেয়নি। সকলে তাঁদের অযোগ্য বলেই ধরে নিয়েছে। তবে সেই কঠিন দিনগুলোয় প্রতি মুহূর্তে কৃষ্ণমৃত্তিকা পাশে পান মা ও শাশুড়ি মাকে। ঘরে ছোট্ট বাচ্চা। সেই বাচ্চা সামলেছেন তাঁরাই। তিনি শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন চোখ-কান বুজে। আজ শুধু একটাই আর্তি কৃষ্ণমৃত্তিকার, ‘আমরা কোনও দোষ না করেও যে শাস্তি পেলাম, একজনও নির্দোষ যেন সেই শাস্তি না পান।’

  • Link to this news (এই সময়)