• নন্দিনী মিত্রের প্রয়াণ আমার কাছে অতি নিকটাত্মীয় বিয়োগের মতো: সঞ্জয় বসু
    এই সময় | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • সঞ্জয় বসু

    বিখ্যাত আইনজীবী পরিবারের মেয়ে তিনি। স্বামী প্রখ্যাত ব্যারিস্টার। ছেলেও আইনি পেশায় উজ্জ্বল নাম। মেয়ে নামী লেখক তথা পাবলিশার। কিন্তু তিনি যে পরিবার সামলে সমাজের পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের শিক্ষা বা হাতের কাজ শিখিয়ে স্বনির্ভর করার ক্ষেত্রে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা ক’জন জানেন? তিনি নন্দিনী মিত্র।

    দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৮৪ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর স্বামী, প্রখ্যাত ব্যারিস্টার তথা রাজ্যের প্রাক্তন অ্যাডভোকেট জেনারেল অনিন্দ্য মিত্রের চেম্বার জুনিয়র হিসেবে যখন আইনি পেশায় কাজ শুরু করেছিলাম তখন থেকেই চিনতাম নন্দিনী দেবীকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর সঙ্গে একটা অত্মীয়তার সম্পর্কও তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমার এবং আমার মতো অনেকেরই। নন্দিনীদেবীর বাবা, প্রাক্তন অ্যাটর্নি কেশবচন্দ্র বসু শুধু বিখ্যাত আইনজীবী ছিলেন এমন নয়, তিনি কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলার, পরে ডেপুটি মেয়র এবং মেয়রও হয়েছিলেন।

    উত্তর কলকাতার মদন মিত্র লেনে ১৯৪২-এর ২ জানুয়ারি জন্ম নন্দিনী দেবীর। ছোট থেকেই পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। প্রথমে হোলি চাইল্ড স্কুল ও পরে লোরেটো হাউসে পড়াশোনা। তার পরে লোরেটো কলেজ থেকেই দক্ষতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন স্নাতকে। ১৯৬৩-তে অনিন্দ্যবাবুর সঙ্গে বিয়ে। দুই ছেলেমেয়ে অভ্রজিৎ মিত্রও পেশায় আইনজীবী, মেয়ে হিমাঞ্জলি (শঙ্কর) একদিকে নামী ফিকশন রাইটার, অন্যদিকে পাবলিশার।

    আদ্যন্ত গৃহবধূ হয়েও নিজেকে বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি নন্দিনীদেবী। মিশনারিজ় অফ চ্যারিটির পাশাপাশি অনেকগুলি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বরাবর। মাদার টেরেসার সঙ্গেও ওঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। পরে ১৯৯৯-এ ‘আনন্দন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী (NGO) সংস্থা গড়ে তোলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন সমমনোভাপন্ন আরও কয়েকজন মহিলা। এঁদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করানো। শুধু পড়াশোনা নয়, নানা ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থাও আস্তে আস্তে শুরু করেছিলেন নন্দিনীদেবীরা। তাঁদের হাত ধরে এখন ‘আনন্দন’ রাজ্যের আরও কয়েকটি প্রান্তেও নতুন শাখা চালু করেছে। ছোটদের পাশাপাশি বড়দের স্কিল ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্তও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ এখনও করে চলেছে ‘আনন্দন’।

    একদিকে যেমন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নতুন আলোর দিশা দিয়ে গিয়েছেন নন্দিনীদেবী, তেমনই আবার বাড়ির ভিতরে আমাদের সঙ্গেও ওঁর অসম্ভব সখ্য তৈরি হয়েছিল। অনিন্দ্যবাবুর চেম্বার জুনিয়র হিসেবে যখন কাজ করছি, তখন ওঁর সঙ্গে আমাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। নিজের ছেলের মতোই আমাদের দেখতেন। আবার বলা যায়, আমাদের হাত ধরেই কম্পিউটারে হাতেখড়ি হয়েছিল ওঁর। আমাদের কাজকর্ম দেখতে দেখতেই কম্পিউটারে অনেকটা উৎসাহ তৈরি হয়েছিল।

    গত প্রায় ১৩-১৪ বছর ধরে অ্যালঝাইমার্সে (Alzheimer’s) ভুগছিলেন ঠিকই। চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ওঁর যোগাযোগটা একইরকম ছিল দীর্ঘদিন। ওঁর হাতে গড়া ‘আনন্দন’কেও আগলে রেখেছিলেন বরাবর। ওঁর স্মিত হাসি, যে কোনও ধরনের, যে কোনও বয়সের মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা ওঁকে অনন্যা করে তুলেছিল। নন্দিনীদেবীর প্রয়াণ অনেকের মতো আমার কাছেও এক ব্যক্তিগত ক্ষতি। অনিন্দ্যবাবু, অভ্রজিৎ, হিমাঞ্জলি এবং ওঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধের প্রতি আমার সমবেদনা রইল।

  • Link to this news (এই সময়)