সুনন্দ ঘোষ
জেট এয়ারওয়েজ়–এর এক এয়ারহস্টেসকে পছন্দ হয়েছিল মুম্বইয়ের এক ব্যবসায়ীর। জানা যায়, তাঁর প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী একদিন জেটেরই একটি ফ্লাইটের শৌচালয়ে টিস্যু পেপারে লিখে দেন ‘বিমানে বোমা আছে’। পরে ধরা পড়েন এবং ‘কুকীর্তি’–র জন্য দুঃখপ্রকাশও করেন।
তদন্তকারীদের দাবি, বিমানে বা বিমানবন্দরে ‘বোমা রাখা’ বলে যত খবর এতদিন এসেছে, তার প্রায় ১০০ শতাংশই ভুয়ো। তবু, এখনও এ ধরনের কোনও বার্তা অবজ্ঞা করা যায় না, করাও হয়ও না এবং পুলিশ তদন্তে নামে। এই তদন্তকারীরাই জানাচ্ছেন, ধৃতদের জেরা করে এ পর্যন্ত নানা কারণের কথা উঠে এসেছে। কারও মানসিক রোগ, কেউ নিছক মজা করেছিলেন, কারও ব্যবসায়িক শত্রুতা, কারও ব্যক্তিগত কোনও কারণ। এই কারণগুলির মধ্যে একটা বড় অংশই ‘ক্ষোভ’। জেট–এর সেই ঘটনার পরে ক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ইন্ডিগোর কলকাতা–শিলং এবং ডিব্রুগড়–কলকাতা বিমানের শৌচালয়ে ‘বোমা রাখা আছে’ লেখা পাওয়া যায়। কাকতালীয় ভাবে সে দিন ছিল ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’। দু’য়ে দু’য়ে চার হয়ে ফিরে আসে জেট এয়ারওয়েজ়–এর সেই ঘটনার স্মৃতি। তদন্তকারীদের প্রশ্ন — তা হলে কি সে দিনও ক্ষোভ থেকেই দু’টি ঘটনা ঘটেছে, যার পিছনে প্রেমে প্রত্যাখ্যানের মতো কোনও কারণ ছিল?
সে দিন ওই দুই ফ্লাইট মিলিয়ে ছিলেন প্রায় ১৩০ জন যাত্রী। তাঁদের সকলকেই নোটিস পাঠিয়ে কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক (এনএসসিবিআই) বিমানবন্দর থানায় ডেকে পাঠানো হয়েছে। শিলং ফ্লাইটে যে চিরকুট পাওয়া গিয়েছে, সেটি ইংরেজিতে লেখা ছিল। সূত্রের খবর, যাঁরা থানায় আসবেন, তাঁদের হাতের লেখার নমুনা নিয়ে মিলিয়ে দেখা হবে সেই চিরকুটের সঙ্গে। ডিব্রুগড় থেকে আসা ফ্লাইটের শৌচালয়ের আয়নায় লিপস্টিক দিয়ে লেখা ছিল বোমার কথা। ফলে, সে ক্ষেত্রে হাতের লেখা মেলানোর অবকাশ নেই বলেই দাবি তদন্তকারীদের।
বিমানে বা বিমানবন্দরে ‘বোমা রাখা আছে’ বলে এক সময়ে হুমকি ফোন আসত। তার নম্বর ট্রেস করে খোঁজ পাওয়া সহজ ছিল। পরে ই–মেলে হুমকি আসতে শুরু করে। তারও উৎস বা আইপি অ্যাড্রেস বের করে ফেলেন তদন্তকারীরা। সম্প্রতি বিমানের শৌচালয়ে মূলত টিস্যু পেপারে ‘বোমা রাখা আছে’ বলে হুমকি আসছে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যে কোনও তদন্তে এখন সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে সিসিটিভি ফুটেজ। বিমানের কেবিনে একটিই ক্যামেরা থাকে। সেটি ককপিটের দরজার ঠিক বাইরে। কেউ নক করে ককপিটে ঢুকতে চাইলে, পাইলট ওই ক্যামেরার সাহায্যে সেই ব্যক্তির মুখ দেখতে পান। পাইলটদের কথায়, ‘এই ক্যামেরায় রেকর্ড করার কোনও অপশন নেই। তা তদন্তের কাজে লাগবে না।’ ফলে, সামনে বা পিছনের শৌচালয়ে কে বা কারা ঢুকছেন, তা বের করা মুশকিল।
এয়ারলাইন্স কর্তারা জানাচ্ছেন, মূলত চার ধরনের মানুষের শৌচালয়ে ঢোকার অ্যাকসেস রয়েছে। ল্যান্ড করার পরে যাত্রীরা নেমে গেলে খালি বিমানে ওঠেন নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররা। তাঁরা সব খতিয়ে দেখার পরে ওঠেন ক্লিনিং স্টাফরা। তাঁরা পরিষ্কার করে নেমে গেলে এয়ারহস্টেসরা ওঠেন। শেষে যাত্রীরা। এক তদন্তকারীর কথায়, ‘সে অর্থে এঁদের কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন।’
কলকাতা–শিলং ফ্লাইটে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে বিমান থেকে চিরকুট পাওয়া গিয়েছে। সে ক্ষেত্রে সিকিউরিটি, ক্লিনিং স্টাফ, এয়ারহস্টেস এবং যাত্রী — সন্দেহের তির সকলের দিকেই। কিন্তু, ডিব্রুগড়–কলকাতা ফ্লাইটে মাঝ আকাশে বার্তা মিলেছে। এ ক্ষেত্রে সিকিউরিটি বা ক্লিনিং স্টাফদের সন্দেহের বাইরে রাখা হচ্ছে। যেহেতু শৌচালয়ের আয়নায় লিপস্টিক দিয়ে লেখা ছিল, তাই মহিলা যাত্রী এবং এয়ারহস্টেসরাই আতশকাচের নীচে চলে আসছেন।
এমন পরিস্থিতিতে তল্লাশির কারণেই একটি ফ্লাইট ছাড়তে কমপক্ষে চার ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে এয়ারলাইন্সের অন্য সূচিতে। গত ১৮ জানুয়ারি, দিল্লি থেকে বাগডোগরার পথে ইন্ডিগোরই একটি ফ্লাইটের শৌচালয়ে বোমা রাখার খবর মেলে। ফ্লাইট ডাইভার্ট করে লখনৌয়ে নামে। এ সবের কারণে প্রভূত আর্থিক ক্ষতিও হয় এয়ারলাইন্সের। প্রশ্ন উঠেছে, এয়ারহস্টেস বা এয়ারলাইন্সের অন্য কর্মী কেন নিজের সংস্থার ক্ষতি করবেন? বিমানবন্দরের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত অফিসারদের দাবি, সংস্থার উপরে ক্ষোভ থেকে এয়ারলাইন্সের কর্মীরা এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তেমন উদাহরণও কম নেই!