এই সময়, নয়াদিল্লি: উত্তর শহরতলির বেলঘরিয়া, কামারহাটি এবং আড়িয়াদহ এলাকার ‘ত্রাস’ হিসেবে পরিচিত জয়ন্ত সিং ওরফে জায়ান্ট সিংয়ের জামিনের বিরোধিতা করে রাজ্য সরকার কেন দ্রুত আদালতের দ্বারস্থ হলো না— তা নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। জায়ান্টের মতো এমন একজন অভিযুক্ত, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে অন্তত ১৫টি এফআইআর আছে, তাঁর জামিন বাতিলের জন্য রাজ্য সরকার আলাদা করে কেন মামলা করেনি— সে প্রশ্ন তুলে রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পীযূষ পাণ্ডের হলফনামা তলব করেছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রাজেশ বিন্দলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানির আগেই সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে এ নিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি। হলফনামায় তাঁর যুক্তি, হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল অভিযুক্ত (জয়ন্ত সিং) ব্যারাকপুর কমিশনারেটের অধীনস্থ এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না৷ এই শর্তকে আইন–শৃঙ্খলা সংক্রান্ত উদ্বেগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল৷ ফলে পুলিশের তরফে ধারণা ছিল, জায়ান্ট জামিন পেলেও তাঁর ‘স্বাধীনতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা সীমিত’৷ ‘এই ধরনের মূল্যায়ন অপর্যাপ্ত এবং ভুল ছিল’— হলফনামায় স্বীকার করে নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি৷ ‘পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এই প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থী’— এমনও যুক্তি দিয়েছেন তিনি৷ তবে ভারপ্রাপ্ত ডিজিপির যুক্তি, এটা ‘পদ্ধতিগত ত্রুটি’, ইচ্ছাকৃত ভাবে কর্তব্যে অবহেলা করা হয়নি৷ মামলার তদন্তকারী অফিসার দ্রুত ব্যবস্থা নেননি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘটনার বিবরণ দেননি বলে জানিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, ওই অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস শুরু হয়েছে৷ বেলঘরিয়ার এসিপিকেও কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে৷
এক যুবক ও তাঁর মাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় ২০২৪–এর ৩ জুলাই দক্ষিণেশ্বর থানায় এফআইআর হয় জায়ান্টের বিরুদ্ধে। সেই মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। সেই মামলাতেই গত বছর ১০ অক্টোবর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরী শর্ত সাপেক্ষে জায়ান্টের জামিন মঞ্জুর করেন। শর্ত হিসেবে বলা হয়, ব্যারাকপুর কমিশনারেট এলাকায় অভিযুক্ত ঢুকতে পারবেন না। যদিও মামলাকারী অরিত্র ঘোষ এই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। জামিনে স্থগিতাদেশ দেয় শীর্ষ আদালত। এর মধ্যে আবার জায়ান্ট ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে আরও একজনকে মারধরের ছবি ও ভিডিয়ো (যার সত্যতা ‘এই সময়’ যাচাই করেনি) ভাইরাল হয়। সেখানেও পৃথক মামলা দায়ের হয়। এই দু’টি মামলাতেই জেলে রয়েছেন অভিযুক্ত। এ ছাড়া জায়ান্টের বিরুদ্ধে সরকারি জলা বুজিয়ে বেআইনি ভাবে বহুতল তৈরির মামলাও ছিল। সেই মামলায় পুরসভাকে অট্টালিকা ভাঙার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। তা নিয়ে এখনও দড়ি টানাটানি চলছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুনের চেষ্টা, বেআইনি অস্ত্র রাখার মতো ১৫টির বেশি গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত জায়ান্ট।
শীর্ষ আদালতের প্রশ্ন, এমন গুরুতর অভিযুক্তের জামিন হাইকোর্ট মঞ্জুর করলেও পুলিশ কেন উচ্চতর আদালতে গেল না? এ দিন ডিজিপির হলফনামায় বলা হয়েছে, জায়ান্টের মতো ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য রাজ্য পুলিশ একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা এসওপি তৈরি করেছে, যেখানে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংগঠিত অপরাধ চক্র বন্ধের উপরে৷ এ বার থেকে যে কোনও সংগঠিত অপরাধের ট্রায়াল মনিটর করবে রাজ্য পুলিশের ‘ল-সেল’, এসওপিতে সে কথাও উল্লেখ করেছেন ডিজিপি৷ তাতে বলা হয়েছে, সংগঠিত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও অভিযুক্তর জামিন হলে দ্রুততার সঙ্গে তা চ্যালেঞ্জ করবে রাজ্য পুলিশ৷ রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখা জামিনে ছাড়া পাওয়া অভিযুক্তদের বিষয়ে প্রতি মাসে রিপোর্ট দেবে৷ জামিনের শর্ত অভিযুক্তরা কঠোর ভাবে মানছে কি না, সে দিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখবে রাজ্য পুলিশ৷
বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালতে শুনানি চলাকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি নিজে ভার্চুয়ালি হাজির ছিলেন৷ তাঁর হলফনামা দেখে বিচারপতি বিন্দল প্রশ্ন তোলেন, কেন আগে এই ধরনের ‘এসওপি’ তৈরি করা হয়নি৷ ১৭ মার্চ হবে এই মামলার পরবর্তী শুনানি৷ মামলাকারী অরিত্রর হয়ে এ দিন সওয়াল করেন আইনজীবী শাম্ব নন্দী৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে রাজ্য সরকারও জায়ান্টের বিরুদ্ধে আলাদা করে স্পেশাল লিভ পিটিশন ফাইল করেছে৷