এই সময়: প্রশ্নটা জরুরি। উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো না–থাকলে স্তন ক্যান্সারের (Breast Cancer) চিকিৎসা কী ভাবে শুরু হবে? এই বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনল ন্যাশনাল কমপ্রিহেন্সিভ ক্যান্সার নেটওয়ার্ক (এনসিসিএন) (National Comprehensive Cancer Network)। এবং তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার রিসোর্স–স্ট্র্যাটিফায়েড গাইডলাইন্স (ভারশান ৪.২০২৫)-এ প্রথম বার উল্লেখযোগ্য অবদান রাখল বাংলার চিকিৎসা–অভিজ্ঞতা ও গবেষণা। এই গাইডলাইন প্রণয়নের কাজে অন্যদের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছেন কলকাতার স্তন ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসক সৌমেন দাস। তিনি এই সংস্করণে অবদান রাখা প্রথম বাঙালি চিকিৎসক এবং ভারত থেকে একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি।
চিকিৎসক মহলের মতে, আমেরিকা–সহ বিশ্বের বহু দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এনসিসিএন-এর নির্দেশিকা কার্যত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ (Gold Standard) হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র, নীতি নির্ধারক সংস্থা ও চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকা অনুসরণ করেন। কিন্তু উন্নত দেশের চিকিৎসা মডেল সরাসরি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলিতে প্রয়োগ করা সব সময়ে সম্ভব নয়। সেই বাস্তবতা থেকেই তৈরি হয়েছে রিসোর্স–স্ট্র্যাটিফায়েড গাইডলাইন্স, যেখানে সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও কী ভাবে বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তার সুস্পষ্ট দিশা দেওয়া হয়েছে।
নতুন সংস্করণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাস্তবসম্মত ও সহজলভ্য চিকিৎসা পদ্ধতিকে। বহু এলাকায় ম্যামোগ্রাফির সুবিধে না–থাকায় সাধারণ আলট্রাসোনোগ্রাফিকে কার্যকর ডায়াগনস্টিক মাধ্যম হিসেবে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্পষ্ট করা হয়েছে, নানা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা, প্রাথমিক ইমেজিং এবং উপসর্গ ভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত ক্যান্সার শনাক্ত করার নির্দেশিকাও। তা ছাড়া, যেখানে রেডিয়েশন থেরাপির সুবিধে নেই বা সীমিত, সেখানে কখন সার্জারি বা ওষুধ ভিত্তিক চিকিৎসা উপযুক্ত হবে এবং কখন রোগীকে উন্নততর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো প্রয়োজন— তারও বৈজ্ঞানিক দিশা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সৌমেন দাসের এই অবদানের ফলে আন্তর্জাতিক গাইডলাইনে ভারতের একেবারে বাস্তব চিকিৎসা পরিকাঠামো ও সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছে। তাই, এটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং ভারতীয় চিকিৎসক সমাজের অভিজ্ঞতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বলেই মনে করছেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে চিকিৎসক সৌমেন দাসের বক্তব্য, ‘অত্যাধুনিক প্রযুক্তি না–থাকলেও চিকিৎসা থেমে থাকে না। যুক্তি, বিজ্ঞান ও বাস্তবতার সমন্বয়েই ক্যান্সার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হবে।’