এই সময়: ভোটের আগে কেরালার নাম পরিবর্তন করে ‘কেরলম’ করার প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সায় মিলতেই ফের জোরালো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের দাবি। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন— রাজ্য বিধানসভায় পাস হওয়া ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব পাঁচ বছর ধরে কেন্দ্রের কাছে পড়ে আছে কেন? তাঁর সাফ কথা, ‘বাংলা কেন বঞ্চিত হবে?’
এই ইস্যুতে জেলায় জেলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলছে। বর্ধমানের চিত্রশিল্পী শ্যামলবরণ সাহা মনে করেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনৈতিক নয়। কেরলম হলে বাংলা হবে না কেন?’ কবি তপন মণ্ডলের মতে, ‘নাম বদলে বাস্তবে কিছু পরিবর্তন হয় না। বাংলা ও বাংলাদেশ নামের সাযুজ্যও ভাবনার বিষয়।’ শিক্ষক সনাতন সাহা ও ব্যবসায়ী সন্তু ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘নাম বদলে অর্থনীতি বা সমাজে আদৌ প্রভাব পড়বে কি?
অন্য দিকে এমএ-র ছাত্র অনির্বাণ সাহা মনে করেন, ‘বাংলা নামটি কৃষ্টি–সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ক্ষতি নেই, বরং আত্মপরিচয় জোরদার হবে।’ কলেজ ছাত্র দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাম বাংলা হলে বেকার ভাতা বন্ধ হয়ে চাকরির সংস্থান হবে কি? তরুণদের ভাবনা এখন চাকরি।’
দুর্গাপুরের লেখক রণজিৎ গুহ বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ নামের সঙ্গে দেশভাগ ও ইতিহাস জড়িত, তবে বাংলা নামেও আপত্তি নেই। তবে বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রস্তাবিত বাংলা নামে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন না–দেওয়ার পিছনে কোনও রাজনৈতিক কারণ আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।’ আসানসোল–দুর্গাপুর উন্নয়ন সংস্থার (এডিডিএ) (ADDA) চেয়ারম্যান কবি দত্তের প্রশ্ন, ‘একাধিক রাজ্যের নাম বদল হলে বাংলার ক্ষেত্রে দেরি কেন?’
বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের মুখুটির গ্রাম প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপদতারণ ধীবরের প্রস্তাব, ‘বাংলার পাশাপাশি বঙ্গ নামও বিবেচিত হতে পারে, যার ঐতিহাসিক মর্যাদা রয়েছে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘নাম পরিবর্তনে কেন্দ্রের অনুমোদন সাংবিধানিক প্রয়োজন হলেও মানুষের ইচ্ছাই মুখ্য।’ বাঁকুড়ার জামবনি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক উজ্জ্বলকুমার মল্লিক ‘বাংলা’ নামের পক্ষে সওয়াল করেছেন ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদার প্রশ্নে। তাঁর কথায়, ‘বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সব ভাষাতেই যেন বাংলা নামে উচ্চারিত হয় আমাদের রাজ্যের নাম।’ বাঁকুড়ার গোবিন্দ প্রসাদ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমেন রক্ষিতের মতে, ‘বাংলা নামটি পরিষদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও তাৎপর্যপূর্ণ।’
বাঘমুন্ডির প্রাক্তন বিধায়ক ও পুরুলিয়া জেলা কংগ্রেস সভাপতি নেপাল মাহাতো প্রশ্ন তুলেছেন, ‘পূর্ববঙ্গ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ কেন?’ তিনি বলেন, ‘রাজ্যের নাম বঙ্গপ্রদেশ হলেই সুবিধা। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে যুক্তি দেখিয়ে রাজ্যের নাম পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন আমি মনে করি তা সঙ্গত।’ ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অসীম সিংহ জানিয়েছেন, তাঁদের দল ‘বাংলা’ নামের পক্ষেই। পুরুলিয়া জেলা সিপিএম সম্পাদক প্রদীপ রায় স্মরণ করিয়ে দেন, বাম আমলেই নাম বদলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। জেলার ইতিহাস গবেষক প্রদীপ কুমার মণ্ডল ও লোকসংস্কৃতি গবেষক সুভাষ রায় ‘বঙ্গ’ নামকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব পাস হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের হাতে। কেরলমে সায় মেলার পরে তাই প্রশ্ন আরও জোরালো— ‘বাংলা’ কি তবে এখনও অপেক্ষায়?