দেবাশিস দাস
হুগলি নদী আর আদিগঙ্গার সংযোগস্থল খিদিরপুরের দইঘাটে কলকাতা পুরসভার প্রস্তাবিত লিফটিং পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন শহরের নদী বাঁচাও আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, আদিগঙ্গার উপরে এই নির্মাণ হলে মজে যাওয়া আদিগঙ্গার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে বছর দশেকের মধ্যে। যা কলকাতার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রাজ্যের অন্যতম নদী বাঁচাও আন্দোলনকারী সংগঠন ‘আদিগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন’ পুরসভার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কাল, শনিবার বিকেলে মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এই আন্দোলনে থাকবে কলকাতার পরিবেশ, বিজ্ঞান আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠন। রাজ্যের অন্যতম পরিবেশ সংগঠন সবুজ মঞ্চ–এর অন্যতম কর্তা নব দত্ত বলেন, ‘সারা রাজ্যেই অজস্র নদী বিপন্ন। সরকারি প্রকল্প এবং নদীর প্রতি উদাসীনতার কারণেই এই পরিণতি। আদিগঙ্গা বাঁচাতেই হবে।’
দইঘাটে প্রস্তাবিত লিফটিং স্টেশন নিয়ে কেন আপত্তি আদিগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনাকারীদের? তাঁদের বক্তব্য, আদিগঙ্গা হুগলি নদীর একটি শাখা। যা তিন ধারায় প্রবাহিত। একটি ধারা টালিনালা বলে পরিচিত। কলকাতার মধ্যে দিয়ে দইঘাট থেকে গড়িয়া পর্যন্ত সাড়ে পনেরো কিলোমিটার ধরে আদিগঙ্গার যে ধারা প্রবাহিত, সেটাই টালিনালা বলে পরিচিত। এই অংশ গড়িয়ার পরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং সংলগ্ন উত্তর ভাগের কাছে গিয়ে মাতলায় মিশেছে। আর একটি ধারা সোনারপুরের গঙ্গাজোয়ারার কাছে বিদ্যাধরী নদীতে মিশেছে। অন্য একটি ধারা সোনারপুর সংলগ্ন কাটাখাল বা নারায়ণপুর খালে মিশেছে। নদীর গতিপথই বলে দিচ্ছে, আদিগঙ্গা শুধুমাত্র কলকাতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষও এই নদীর সঙ্গে যুক্ত। ফলে শুধুমাত্র দইঘাটে একটি ব্যারেজ বা লিফটিং স্টেশন করে আদিগঙ্গা বাঁচানো যাবে না।
আন্দোলনকারীদের প্রস্তাব, ভবানীপুর, কালীঘাট, বাঁশদ্রোণীর মতো যে সব এলাকা এখনও আদিগঙ্গার জলে প্লাবিত হয়—সেই সব জায়গায় আদিগঙ্গায় যে গেট আছে, সেগুলি ভালো ভাবে পরিষ্কার করে সেখান দিয়ে জল আসা–যাওয়ার পথ মসৃণ করা হোক। আদিগঙ্গায় সব মিলিয়ে এই রকম ৯৭টি লকগেট রয়েছে বলে তাঁরা জানান। আদিগঙ্গায় দীর্ঘকালের জমা পলি ও বর্জ্য পরিষ্কার করে নদীখাত পুনরুদ্ধার করার ব্যবস্থা হলে শহরে জল জমার সমস্যাও কমবে বলে তাঁদের দাবি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নদীর বুক খুঁড়ে কংক্রিটের ব্যারেজ–সহ লিফটিং স্টেশন নির্মাণ করা হলে আদিগঙ্গায় পলি জমার সমস্যা আরও বাড়বে। আদিগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের তরফে তাপস দাস বলেন, ‘ফারাক্কা থেকে গজলডোবা—কোথাও নদীবাঁধের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আদিগঙ্গার উপরে প্রস্তাবিত নির্মাণ সম্পন্ন হলে বছর দশেকের মধ্যে এই নদীরও মৃত্যু হবে। তাই আমরা পুরসভার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছি।’
দইঘাটের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা পুরসভার নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের। কাজ হবে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, যাঁরা এই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি তুলছেন, তাঁদের এর প্রয়োজনীয়তা বোঝার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এই ব্যারেজের দরজা সারা বছর বন্ধ রাখা হবে না। ভারী বর্ষণের সময়ে শহর থেকে দ্রুত জল সরানোর জন্যে এই ব্যারেজের দরজা ঘণ্টা কয়েকের জন্যে বন্ধ করা হবে। সব সময়ে ব্যারেজের দরজা বন্ধ থাকলে নদীর গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তা করা হবে না। এর পরে অতিবৃষ্টি বা ভারী বৃষ্টি হলে আদিগঙ্গা থেকে অতিরিক্ত জল তুলে হুগলি নদীতে ফেলা হবে। বিষয়টির গুরুত্ব বন্যা–পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজনে, ছোট পাত্র থেকে জল তুলে বড় পাত্রে ফেলে দেওয়ার মতো।