• ৫.৫ তীব্রতার কম্পনে থরহরি বঙ্গ, এপার বাংলার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে পলির আস্তরণ
    এই সময় | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    ‘কোয়েক’ অ্যাট দ্য গেটস।

    উত্তরাখণ্ড বা তিব্বতের মালভূমি নয়, নেপাল বা মিয়ানমারও নয় — খাস কলকাতা থেকে মোটে ৯৮ কিলোমিটার দূরে ভূমিকম্পের সৃষ্টি। ভূপৃষ্ঠের মাত্র ৯.৮ কিলোমিটার গভীরে তৈরি হওয়া ওই কম্পনের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ১১ সেকেন্ড। তাতেই আতঙ্ক শহর জুড়ে। যে ভাবে থরথর করে কেঁপেছে বাড়িঘর, তাতে আতঙ্কিত হওয়াই স্বাভাবিক।

    শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিটে কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের বিরাট অংশ, এমনকী, উত্তরবঙ্গের বেশকিছু জায়গার বাসিন্দারা যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন, সাম্প্রতিক অতীতে তেমন নজির নেই। এ এমন এক শত্রু, যার আবির্ভাবের কোনও পূর্বাভাস হয় না। আর সেই জন্যেই সে এতটা ভয়াবহ। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এসসিএস)–এর তথ্য অনুযায়ী ৫.৫ কম্পাঙ্কের যে ভূমিকম্প এ দিন কলকাতার হৃদস্পন্দন অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল, তার উপকেন্দ্র (এপিসেন্টার) ছিল বাংলাদেশের একেবারে পশ্চিম প্রান্তের সাতক্ষীরা। ভূতত্ত্ববিদরা কম্পাঙ্কের নিরিখে তাকে নিতান্তই ‘মাঝারি’ মানের বলে উল্লেখ করলেও নৈকট্য, গভীরতা ও স্থায়িত্বকালের মিলিত ফল ওই কম্পনকে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে আলোচিত কম্পনে পরিণত করেছে।

    গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশের নরসিংদি–তে ভূমিকম্প হয়েছিল। তার পরে ফের শুক্রবারের এই ঘটনা। বাংলাদেশে এত বেশি ভূমিকম্প হওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ইউএসএ–র কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ মাইকেল স্ট্যাকলার বাংলাদেশের ভূতত্ত্বগত পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ আসলে একটি টেকটনিক টাইম বোমার উপরে বসে রয়েছে। এ দেশে যে কোনও সময়ে ৮.২ থেকে ৯.০ কম্পাঙ্কের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি।’ তিনি জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের ভূগর্ভে কয়েক মাইল পুরু পলির স্তরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে একটি বিরাট এবং আবদ্ধ (লকড) মেগাথ্রাস্ট ফল্ট। অর্থাৎ, একাধিক টেকটনিক প্লেটের মিলনস্থল। ভূতত্ত্ববিদদের ব্যাখ্যা, ভূপৃষ্ঠ তৈরি হয়েছে কয়েকটি বিশাল পাথরের স্তরের উপরে। এই স্তরগুলোই ‘টেকটনিক প্লেট’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের নীচে ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা টেকটনিক প্লেট মিলেছে। বিভিন্ন টেকটনিক প্লেট পরস্পরকে ধাক্কা মারলে তখনই ভূমিকম্প হয়।

    বর্ষীয়ান ভূবিজ্ঞানী জ্ঞানরঞ্জন কয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশে ভূগর্ভে বেশ কয়েকটা ‘হিডেন ফল্টলাইন’ বা লুকোনো চ্যুতিরেখা রয়েছে। চ্যুতিরেখা হলো ভূস্তরের ফাটল। বাংলাদেশের এই চ্যুতিরেখাগুলো ‘লুকোনো’, কারণ, এদের উপরে বেশ কয়েক কিলোমিটার পুরু পলির আস্তরণ থাকায় সহজে এদের শনাক্ত করা যায় না। কিন্তু মাঝে মাঝেই ভূমিকম্পের কারণ হয়ে এরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।’ এই ‘হিডেন ফল্টলাইন’–গুলো হলো — ৩২০ কিমি দীর্ঘ ডাউকি ফল্ট, ১৫০ কিমি দীর্ঘ মধুপুর ফল্ট এবং ৩০০ কিমি দীর্ঘ আসাম-সিলেট ফল্ট। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর বয়ে আনা ঘন পলির প্রায় ১৮ কিলোমিটার পুরু স্তর এই ফল্টলাইনগুলোকে ঢেকে রেখেছে। এর ফলে এদের যথাযথ মানচিত্রায়ন করা খুব কঠিন। বাংলাদেশে অতি অল্প জায়গার উপরে প্রায় ১৪ কোটি মানুষের বসবাস হওয়ায় এই এলাকায় ৮ বা ৯ কম্পাঙ্কের ভূমিকম্পের প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ একটি মেগাথ্রাস্ট ফল্ট এবং অন্তত তিনটি ‘হিডেন ফল্টলাইন’–এর উপরে থাকায় খুব বেশি করে ভূমিকম্পপ্রবণ। কিন্তু কলকাতার নীচে তো এমন কিছু নেই। তবুও কলকাতা ভূমিকম্পে নিরাপদ নয় কেন? শুক্রবারের কম্পাঙ্ক ‘মাত্র’ ৫.৫ হওয়ার পরেও কলকাতা এমন ভাবে কাঁপলই বা কেন?

    জবাবে ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি–র ডিরেক্টর ওমপ্রকাশ মিশ্র বলেন, ‘ভূমিকম্প–প্রবণতার যে মানচিত্র রয়েছে, তাতে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা সিসমিক জ়োন ফোর এবং কলকাতা সিসমিক জ়োন থ্রি–তে রয়েছে। তাই দক্ষিণবঙ্গের অনেকটা জায়গাই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।’ কেন এমন অবস্থা, সেটা বোঝাতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রাক্তন ডিন সোমনাথ ঘোষ বলেন, ‘দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চল তৈরি হয়েছে ঘন পলিমাটির প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার পুরু স্তরের উপরে। ভূমিকম্প হলে এই ধরনের স্তর তরলের মতো আচরণ করে। একে ‘লিকুইফ্যাকশন’ বলে। অর্থাৎ জলে ঢিল মারলে যেমন তরঙ্গ তৈরি হয়, ভূমিকম্প হলে মাটির গভীরেও ওই রকম ঢেউ খেলে।’ এ ছাড়া সল্টলেক অঞ্চলটি তৈরি হয়েছে একটি ‘হিঞ্জ জ়োন’–এর উপরে। অর্থাৎ এই এলাকার ভূগর্ভে একটি পাথরের স্তর ‘সর্বোচ্চ বক্র’ (ম্যাক্সিমাম কার্ভেচার) অবস্থায় রয়েছে। তাই সল্টলেকও অত্যন্ত বিপদের মুখেই।

    শুক্রবার মাঝারি কম্পাঙ্কের একটি ভূমিকম্পই আরও একবার মনে করালো সে কথা।

  • Link to this news (এই সময়)