দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া
দোলের রঙে ছেয়ে গিয়েছে বাজার। রঙবেরঙের আবির, পিচকারি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এর অধিকাংশই রাসায়নিক মেশানো। অথচ বেশ কয়েক বছর ধরে বাজারে চাহিদা বেড়েছে ভেষজ আবিরের। যা তৈরি হয় মূলত ফুল থেকে। চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাজারে ভেষজ আবিরের জোগান কম। ফুল থেকে আবির-সহ অন্য উপজাত সামগ্রী তৈরি এবং সুরক্ষিত ও উন্নত উপায়ে ফুলচাষের লক্ষ্যে পাঁশকুড়ায় কেন্দ্রীয় গুচ্ছ (ক্লাস্টার) উন্নয়ন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিন বছর পরেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই প্রকল্প। তাই দোলে ফুলের উপত্যকার মানুষজনকে ভরসা রাখতে হচ্ছে বাজার চলতি রাসায়নিক আবিরেই।
ফুল চাষের মানচিত্রে রাজ্যে দ্বিতীয় পূর্ব মেদিনীপুর। জেলার পাঁশকুড়া, কোলাঘাট, শহিদ মাতঙ্গিনী ও তমলুক ব্লকে ফুলের চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ফুল চাষ হয় পাঁশকুড়ায়। গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা, বেল, জুঁই-সহ ২০ থেকে ২৫ রকমের ফুলের চাষ হয়। সাধারণত দেখা যায়, যখন বাজারে ফুলের জোগান অঢেল থাকে, তখন দাম পাওয়া যায় না। সে জন্য চাষিরা অনেক সময় রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে ফুল ফেলে দিতে বাধ্য হন। এর ফলে একদিকে ফুল পচে যেমন দূষণ ছড়ায়, তেমনই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন ফুলচাষিরা। ফুল থেকে আতর, আবির, রংয়ের মতো উপজাত সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব। বহু বছর ধরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ফুলচাষিরা ফুল থেকে উপজাত সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও পরিকাঠামো তৈরির আবেদন জানালেও এখনও কোনও সরকারি উদ্যোগ নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ।
প্রায় দেড় দশক আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দত্ত ফুল থেকে আবির ও রং তৈরি করার পথ দেখিয়েছিলেন। সেই সময়ে সরকারি উদ্যোগে হাওড়ার ঘোড়াঘাটায় একটি স্কুলে বৃত্তিমূলক বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ফুল থেকে আবির ও রং তৈরির কাজ শুরু হয়। তবে সেই প্রকল্প বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পূর্ব মেদিনীপুরে ফুল থেকে ভেষজ আবির ও রং তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে কয়েক বছর আগে সারা বাংলা ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির তরফে তৎকালীন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী রাধারমণ সিংহ এবং রাজ্যের উদ্যানপালন দপ্তরের মন্ত্রী আব্দুর রেজ্জাক মোল্লাকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এই নিয়ে কোনও সরকারি পদক্ষেপ নজরে পড়েনি। ফুলের উপত্যকা পাঁশকুড়ায় তাই মিলছে না ভেষজ আবির। বছরভর যাঁরা ফুল ফোটানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন তাঁদেরও দোলের সময় একে অন্যকে রাঙিয়ে তুলতে ভরসা রাসায়নিক আবিরই।
সারা বাংলা ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সংগঠনের সম্পাদক নারায়ণচন্দ্র নায়ক বলেন, পূর্ব মেদিনীপুরে ফুল থেকে ভেষজ আবির তৈরির সমস্ত সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ না থাকায় ফুলচাষিরা বঞ্চিত হচ্ছেন। আমাদের দাবি, পাঁশকুড়ার ভেষজ আবিরের কারখানা গড়ে তুলুক সরকার।' উদ্যানপালন দপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, 'ভেষজ আবির তৈরির ব্যাপারে কিছু সংস্থার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তবে কোনও সংস্থা আগ্রহ দেখায়নি। গুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভেষজ আবির তৈরি বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে।'