দেওয়ালে ঝোলানো বড় আয়না। সামনে চেয়ারে বসে আছেন এক যুবক। গলায় কাপড় জড়ানো। আর পিছনে দাঁড়িয়ে নিপুণ দক্ষতায় তাঁর চুলে কাঁচি চালাচ্ছেন ‘সরকারি নাপিত’! পাশের বেঞ্চে অপেক্ষা করছেন আরও কয়েক জন। তাঁরাও চুল-দাড়ি কাটাবেন। মাঝে মাঝে তাড়াও দিচ্ছেন, ‘আর কতক্ষণ?’ কর্নাটকের (Karnataka) গদগ জেলার সিঙ্গাতালুর গ্রামে গেলে এমন তাজ্জব ছবি দেখতে পাবেন যে কেউ। খোদ রাজ্য সরকারই এখানে সেলুন (Government salon) খুলেছে!
হ্যাঁ, রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই সেলুন খোলা হয়েছে কর্নাটকে। ‘সরকারি নাপিত’-রা চালাচ্ছেন সেই সেলুন। কিন্তু কেন এমন সিদ্ধান্ত? এর পিছনে রয়েছে এক করুণ কাহিনি। কয়েক সপ্তাহ আগে সিঙ্গাতালুর গ্রামের এক সেলুনের মালিক দলিতদের চুল কাটতে অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ। পরিস্কার জানিয়ে দেন, ‘অন্য দোকানে যাও বাপু।’ কিন্তু সব সেলুনে একই কথা। শেষে নিরুপায় হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হন দলিত যুবকেরা। সঙ্গে সঙ্গে সেলুনগুলিকে নোটিস পাঠানো হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
গ্রামবাসীদের একাংশ জানান, মহানবমীর সময়ে হাড়পদ সম্প্রদায়ের বাড়িতে দেবতা বীরভদ্র স্বামী (শিবের এক রূপ) আসেন বলে বিশ্বাস গ্রামবাসীদের। এই সময়ে দলিতদের চুল-দাড়ি কাটলে অকল্যাণ হতে পারে। তাই তাঁদের মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দেন সেলুন মালিকরা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এমন জাতপাতের ঘটনায় চমকে ওঠে গোটা দেশ। এর বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচারও শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি কোনও।
শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার সিঙ্গাতালুর গ্রামে সেলুন খোলে জেলা সমাজ কল্যাণ দপ্তর। ঘোষণা করে দেওয়া হয়, দলিতরা এখানে চুল-দাড়ি কাটতে পারবেন। পরিষেবা পাবেন অন্যরাও। ধুমধাম করে সেলুনের উদ্বোধন করেন গদগ সমাজকল্যাণ বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর নন্দা হানাবাত্তি। তিনি বলেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে চলতে হবে। সমাজে কোনও উঁচু-নীচু ভেদাভেদ যেন না থাকে।’ সেলুনে চুল-দাড়ি কাটার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাসভরাজ হাডপাদা নামে এক যুবককে। তিনি পাশের গ্রাম টিপ্পাপুরের বাসিন্দা। দলিতদের চুল-দাড়ি কাটতে কোনও আপত্তি নেই তাঁর। তবে সিঙ্গাতালুর গ্রামের কেউই এমন সেলুন চালাতে রাজি হননি।
দলিতদের জন্য রাজ্য সরকার নিজে সেলুন খুলছে, এই খবরে চমকে গিয়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ বাহবা দিচ্ছেন। আবার প্রশ্নও তুলতেও ছাড়ছেন না অনেকে। তাঁদের স্পষ্ট কথা, যাঁরা দলিতদের চুল-দাড়ি কাটতে অস্বীকার করলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? দীর্ঘদিন ধরে দলিতদের উন্নয়নে কাজ করছেন কারিয়াপ্পা গুড়িমানি। তিনি সোজাসুজি বলে দিলেন, ‘সরকারের আরও কড়া পদক্ষেপ করা উচিত।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘শুধু তো সেলুন নয়, বাজার, মুদিখানা থেকে শুরু করে অনেক দোকানেই এমন বৈষম্যের শিকার হতে হয় দলিতদের। সরকার কি তা হলে সেই সবেরও দোকান খুলবে?’