এই সময়: খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম। বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে দেখা গেল, সেখান থেকে বাদ পড়েছেন আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ ভোটার। তবে এখানেই শেষ নয়, নির্বাচন কমিশনের ঘোষণামতো ‘ডিসপিউটেড’ বা বিতর্কিত তালিকায় থাকা প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে থেকে কতজনের এ বার ভোটাধিকার থাকবে, সে দিকে নজর রয়েছে সবার। এ দিন যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলো, সেখানে এই ‘ডিসপিউটেড’ ভোটারদের নাম থাকলেও তাঁদের প্রত্যেকের নামের পাশে ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন শব্দটি লেখা রয়েছে। বিচারক বা জুডিশিয়াল অফিসাররা তাঁদের নথি স্ক্রুটিনি সম্পূর্ণ করার পরে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশিত হলে বোঝা যাবে, এ বার পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে সব মিলিয়ে কত নাম বাদ গেল। ‘সার’–এর খসড়া তালিকায় নাম ছিল ৭ কোটি ৮ লক্ষের মতো ভোটারের। এ দিন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে কমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেই তালিকা থেকে এখনও পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাদ গিয়েছে। আর ফর্ম–৬ ও ফর্ম–৮ পূরণ করে নতুন করে নাম উঠেছে প্রায় ১ লক্ষ ৮৯ হাজার জনের। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রিক ভোটার তালিকা অনুযায়ী, চূড়ান্ত লিস্টে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে উত্তরবঙ্গের ডাবগ্রাম–ফুলবাড়ি কেন্দ্রে। সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার ভোটারের নাম এ দিন বাদ গিয়েছে। তারপরেই রয়েছে দক্ষিণবঙ্গের মতুয়া অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্র উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা (১৫,৩০৩)। আর সবচেয়ে কম, ৪ জনের নাম বাদ গিয়েছে পুরুলিয়া কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে।
এ দিন সকালে প্রথমে অনলাইনে প্রকাশিত হয় তালিকা। তবে উদ্বেগ ও আশঙ্কা নিয়ে একসঙ্গে বহু মানুষ অনলাইনে সার্চ করার ফলে একটা সময়ে কমিশন ও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) সাইট ক্র্যাশ করে যায়। তবে বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) পাশাপাশি সব জেলায় জেলাশাসক, মহকুমা শাসক ও বিডিও অফিসেও টাঙিয়ে দেওয়া হয় তালিকা। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’–এর আওতায় থাকা ভোটাররা বাদে যাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁরা যদি এর আগে ‘সার’–এর হিয়ারিংয়ে গিয়ে উপযুক্ত নথি জমা দিয়ে থাকেন, তা হলে আগামী ৫ দিনের মধ্যে তাঁরা সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের (ডিইও) কাছে ফের আবেদন জানাতে পারবেন। যদি ডিইও বিষয়টির নিষ্পত্তি না–করেন অথবা তা খারিজ করেন, তিনি তার পরের ৫ দিনের মধ্যে সিইও–র কাছে আবেদন করতে পারবেন। সেখানেও আর্জি খারিজ হলে এ বার আর তিনি ভোট দিতে পারবেন না। অবশ্য আগামী দিনে তিনি ফের উপযুক্ত নথি সমেত ফর্ম–৬ ফিলআপ করে নাম তোলার জন্য আবেদন জানাতে পারবেন।
কমিশন সূত্রের দাবি, সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতেই। এরমধ্যে শীর্ষ রয়েছে মুর্শিদাবাদ। সেখানে ১১ লক্ষের বেশি ভোটার ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ হয়ে রয়েছেন। এর পরেই রয়েছে মালদা (প্রায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার), উত্তর ২৪ পরগনা (৫ লক্ষ ৯১ হাজার) ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৫ লক্ষ ২২ হাজার)। অর্থাৎ এই চারটি জেলাতেই মোট বিচারাধীন ভোটারের ৫০ শতাংশ রয়েছেন।
এ দিন ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরেও মূলত দুশ্চিন্তা থাকছে মতুয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রের মতো যে সব জায়গায় মতুয়াদের সংখ্যা বেশি, সেখানে একটা বড় সংখ্যক ভোটারই ‘ডিসপিউটেড’ তালিকায় রয়েছেন। ফলে তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাগদা ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার বগনাঁ উত্তর (৭,৯২৬), বনগাঁ দক্ষিণ (৬,৯০২), গাইঘাটা (৬,৭৭০), নদিয়ার হরিণঘাটা (৯,০৩৭), রাণাঘাট দক্ষিণ (৭,১২৬), রাণাঘাট উত্তর–পূর্ব (৬,৪০৪), রাণাঘাট উত্তর–পশ্চিমের (৬,৭০৪) মতো অনেকগুলি বিধানসভা কেন্দ্র চূড়ান্ত তালিকা থেকে ইতিমধ্যে বড় সংখ্যায় নাম বাদ পড়েছে। বিচারকরা ‘ডিসপিউটেড’ ভোটারদের নথির নিষ্পত্তি করলে সংখ্যাটা আরও অনেকটা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। এই তালিকায় অনেক বৈধ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে বলে অভিযোগ রাজ্যের শাসকদলের। তবে শাসক–বিরোধী সবারই নজর রয়েছে ‘ডিসপিউটেড’ তালিকা থেকে শেষমেশ কত নাম বাদ পড়ে, তার উপরেই। ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা কেন্দ্রের তৃণমূলের তিনবারের বিধায়ক রফিকুর রহমানও। ‘অ্যাজুডিকেটে
কমিশন সূত্রের দাবি, তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এ বার ফর্ম–৬ পূরণ করে নাম তোলার সংখ্যাও অনেকটা কম। যে হেতু খসড়া তালিকা থেকে অনেকের নাম বাদ পড়েছিল, তাই এ বার নতুন ভোটারদের পাশাপাশি ফর্ম–৬ পূরণ করে নাম তোলার হার বাড়বে বলে মনে করা হয়েছিল। সেই সংখ্যাটা কম হলো কেন, তা নিয়ে বিস্মিত অনেকেই।