• যুদ্ধে তিন ‘বন্ধু’, নয়াদিল্লির অস্ত্র এখন হিসেবি ভারসাম্য
    এই সময় | ০২ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের শিঙা ফুঁকে যাবতীয় কূটনৈতিক সমীকরণের সামনে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিয়েছে ইজ়রায়েল, ইরান এবং আমেরিকা। আর এ হেন ঘোরালো পরিস্থিতিতে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান অনেকটা দড়ির উপর দিয়ে হাঁটার মতো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ। কারণ এই সংঘর্ষে জড়িয়েছে ভারতের এমন তিন ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র, যাদের উপরে অনেকটা নির্ভর করছে নয়াদিল্লির বাণিজ্য এবং কৌশলগত অবস্থান।

    সংঘাতে যুক্ত তিন পক্ষের সঙ্গেই নয়াদিল্লির সম্পর্ক ভালো। শুল্ক-যুদ্ধ পেরিয়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক হালফিলে স্থিতাবস্থার পথে হাঁটা শুরু করেছে। উল্টো দিকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আবার ইজ়রায়েলের সঙ্গেও বন্ধুত্ব ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এর পর্যায়ে, যা আরও দৃঢ় করে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতাইয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তেল আভিভে দাঁড়িয়ে মোদী বলে এসেছেন, ‘পৃথিবীতে সন্ত্রাসবাদের কোনও ঠাঁই নেই — এই বক্তব্যে ভারত এবং ইজ়রায়েলের অবস্থান পরিষ্কার। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করব।’ ফলে বিশ্লেষকদের অনেকেরই বক্তব্য, এই অবস্থায় নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে ভারতকে অত্যন্ত হিসেব কষে এগোতে হবে।

    শনিবার সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরেই ভারতের তরফে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক একটি বার্তায় বলেছে, ‘আমরা সব পক্ষের কাছে সংযম দেখানোর অনুরোধ করছি। উত্তেজনা যাতে না-বাড়ে, তা নিশ্চিত করা হোক। অগ্রাধিকার থাকুক সাধারণ মানুষের সুরক্ষায়। সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডাকে সম্মান জানাতেই হবে।’ বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের বক্তব্য, এই অবস্থান এই মুহূর্তে সবথেকে নিরপেক্ষ এবং ভারতের পক্ষে নিরাপদ। ভারতের অবস্থান সামনে আসার পরেই নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরান দূতাবাসের তরফে রবিবার একটি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভারত এবং স্বাধীনতাকামী সব দেশের কাছে আমাদের অনুরোধ, আমাদের উপরে এই হামলার নিন্দায় আপনারা গর্জে উঠুন। দয়া করে এ ভাবে নীরব থাকবেন না।’ সংঘর্ষ শুরুর পরেই শনিবার ইজ়রায়েল এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর। দু’পক্ষকেই অস্ত্র সংবরণ করে আলোচনার রাস্তায় যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এর পরে একে একে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিদেশমন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেন জয়শঙ্কর।

    সরাসরি আমদানি-রপ্তানির প্রশ্নে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ হয়তো খুব বিশাল নয় (রপ্তানি ১.৬৬ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ৬৭২.১২ মিলিয়ন ডলার)। কিন্তু ভূ-কৌশলগত ভাবে ইরানের গুরুত্ব ভারতের কাছে অনেকটা। মধ্য এশিয়ায় ভারতের রমরমা কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় পাকিস্তান ও চিন। পাকিস্তানকে এড়িয়ে চাবাহার বন্দর এবং হরমুজ় প্রণালির রাস্তা ধরে মধ্য এশিয়ায় ভারতের আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে। ফলে এই বন্দর এবং প্রণালি বন্ধ হলে ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ওমান, ইয়েমেনের মতো দেশ তো বটেই, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তানের মতো দেশগুলির (চাবাহার হয়ে স্থলপথে) সঙ্গেও ভারতের বাণিজ্য-যোগ ছিন্ন হবে। বিপদ এই কারণে যে, এ পথেই আসে ভারতের রেয়ার আর্থ মিনারেল, ইউরেনিয়ামের মতো খনিজ। কূটনীতিকদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে চাবাহার এবং হরমুজ়ে ভারতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এমনিতে ১০ বছরের চুক্তি থাকলেও হালফিলে চাবাহারের শহিদ বেহেশতি টার্মিনালে বিনিয়োগের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে ভারত (মনে করা হচ্ছে, ইরানের উপরে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণেই নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপ)। এই অশান্ত পরিস্থিতিতে ভারত সেখানে বিনিয়োগ কমালে, সুযোগ নিয়ে চাবাহারে ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারে চিন। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বেজিংয়ের নজর রয়েছে চাবাহারে। তার উপরে তারা হলো ইরানের তেলের সবথেকে বড় ক্রেতা। আর সেটা হওয়ার অর্থ, ওই এলাকায় চিনের ‘বন্ধু’ পাকিস্তানেরও প্রভাব বৃদ্ধি। সেটা হলে মধ্য এশিয়ায় ভারতের বাণিজ্য বড় ভাবে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

    ইজ়রায়েলের সঙ্গে ভারতের ‘স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ রয়েছে। ইজ়রায়েলি অস্ত্রের সবথেকে বড় গ্রাহক হলো ভারত। তার উপরে আবার এই মুহূর্তে যৌথ ভাবে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করছে দু’দেশ। যার ফল হলো বারাক-৮ মিসাইল, অত্যাধুনিক ড্রোন এবং আয়রন বিম লেজ়ার সিস্টেম। এ ছাড়া ইরানের চাবাহারের মতো ইজ়রায়েলের হাইফা বন্দর অধিগ্রহণ করেছে একটি ভারতীয় সংস্থা। তার উপরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক ইজ়রায়েল সফরে দু’দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।

    তাই বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে একটাই রাস্তা। হিসেব কষে ভারসাম্য বজায় রাখা। আর নয়াদিল্লি সেটা কতটা করতে পারল, তা আগামী কয়েক দিনের ঘটনাক্রমেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

  • Link to this news (এই সময়)