আজকাল ওয়েবডেস্ক: দোল পূর্ণিমার আগের দিন রাজ্যবাসীর জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা ও কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত দিন কাটালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় নির্মিত কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। একই মঞ্চ থেকে এসআইআর-সংক্রান্ত আতঙ্কে মৃত ৩৬ জনের পরিবারের একজন করে সদস্যের হাতে তুলে দিলেন হোমগার্ডের চাকরির নিয়োগপত্র। পরে প্রাক-দোল উৎসবে অংশ নিয়ে রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছাও জানান তিনি।
কলকাতা ও কল্যাণীর মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তুলতে নির্মিত ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ অত্যাধুনিক ৪/৬ লেনের এই এক্সপ্রেসওয়েতে রয়েছে মোট ২১টি ফ্লাইওভার। সিগন্যাল-ফ্রি এই রাস্তাটি একদিকে নিমতায় বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে গঙ্গার উপর নির্মীয়মাণ ঈশ্বর গুপ্ত সেতু ও ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের বড় জাগুলির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে।
প্রশাসনের দাবি, এতদিন যে পথ অতিক্রম করতে অন্তত দু’ঘণ্টা সময় লাগত, এখন তা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ আরও দ্রুত ও মসৃণ হবে। শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে বলে আশা রাজ্য সরকারের। পশ্চিমবঙ্গ হাইওয়ে ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্ত ছিল এসআইআর সংক্রান্ত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আতঙ্কে মৃত ৩৬ জনের পরিবারের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া। মৃতদের পরিবারের সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। মমতা বলেন, “যাঁরা হারিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁদের পরিবারের পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব।”
মিলন উৎসবের মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, নিউটাউনে জৈন মন্দির নির্মাণের জন্য পাঁচ একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ববাংলা গেটের ৬০০ মিটারের মধ্যে ওই জমি ট্রাস্টের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি। জৈন সম্প্রদায়ের আবেদনের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড ইনট্যানজিবল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন তৈরির ঘোষণা করেছিলেন মমতা। ইতিমধ্যেই প্রায় ২৬১ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে এবং ভিতপুজো সম্পন্ন হয়েছে। শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরের শিলান্যাসের পর এবার নিউটাউনে জৈন মন্দির—ধর্মীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলায় সরকার ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেই দাবি তৃণমূলের।
এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকায় প্রায় ৬৩ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুরেই প্রায় ৪৭ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে বলে দাবি। এদিন প্রথমবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মমতা বলেন, “ভবানীপুর ছোট কেন্দ্র। সেখানে প্রথমে ৪৪ হাজার, পরে আরও ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাহলে ভোটার থাকল কোথায়? ভবানীপুরে আমিই জিতব—এক ভোটে হলেও জিতব।”
তিনি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আক্রমণ করেন। নাম না করে জাতীয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও তোপ দাগেন। অভিযোগ তোলেন, “ভোটারদের নাম ভ্যানিশ করা হচ্ছে। দেশের সংবিধান ও সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বিপদে।”
বিএলও ও ইআরওদের পক্ষেও সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, “চার মাস ধরে তাঁরা কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁদের উপর দায় চাপানো হচ্ছে। দিল্লির বিজেপি অফিসে বসে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।”
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরও প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আমি কোনও সম্প্রদায়ের কথা বলছি না। যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা সাধারণ মানুষ। কাগজ জমা দেওয়ার পরও নাম বাদ যাচ্ছে। জীবিত মানুষ নাম না থাকায় বিপাকে পড়ছেন। প্রাণ যাচ্ছে—এর দায় কার?”
আগামীকাল দোলযাত্রা। তার আগের দিন মিলন উৎসবের মঞ্চে উন্নয়ন, ধর্মীয় পরিকাঠামো, চাকরি এবং ভোটার তালিকা—সব ইস্যুকেই একসূত্রে গেঁথে রাজনৈতিক বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, “রঙের উৎসব মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিক।”দোলের আবহে রঙিন মঞ্চ, কিন্তু বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত—এই দ্বৈত সুরেই শেষ হল দিনের অনুষ্ঠান।