• বঙ্গে কার শাসন চান! তৃণমূলে বিভেদ কি লক্ষ্য শাহের?
    এই সময় | ০৩ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’য় অংশ নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি–অস্ত্রে শান দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে রেশন কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা–মন্ত্রীদের নাম, সবই ঠাঁই পেল তাঁর ভাষণে। তবে বিধানসভা ভোটের মুখে আক্রমণের অভিমুখ আরও নির্দিষ্ট করতে সোমবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের জনসভা থেকে শাহ বারবার নিশানা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। প্রকাশ্য সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তা, ‘এ বার তৃণমূল সরকারকে ভোট দিলে বাংলায় অভিষেকের শাসন হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন আর থাকবে না।’ বা‍ংলার ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, ‘আপনারা কি অভিষেকের শাসন চান?’ শাহের দাবি, ‘অভিষেককে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসাতে চান মমতা।’

    এর কড়া জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন অভিষেকও। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৮ মার্চ একই মাঠে জনসভা করবেন তিনি। সেখান থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাল্টা আক্রমণ শাণাবেন তিনি। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, বিধানসভা ভোটের মুখে তৃণমূলের অন্দরে সন্দেহের বাতবরণ তৈরির লক্ষ্যেই ‘অভিষেকের শাসন’ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন শাহ। বঙ্গ–শাসনের কন্ট্রোল নিজের হাতে নেওয়ার কোনও পরিক‍ল্পনা অভিষেকের আছে, এমন ইঙ্গিত বাংলার রাজনৈতিক মহলকে তিনি নিজে কখনও দেননি। বরং ২০২৬–এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই টানা চতুর্থবার বাং‍লার মুখ্যমন্ত্রী করার আহ্বানই তিনি জানাচ্ছেন ভোট প্রচারে বেরিয়ে। এ দিনও মথুরাপুরে শাহের সভার ঘণ্টাখানেক আগে কলকাতার নজরুল মঞ্চে দলীয় কর্মসূচি থেকে অভিষেককে বলতে শোনা যায়, ‘এ বারের বিধানসভা ভোট ২৫০–এর বেশি আসন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েক চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী করার লড়াই। বিজেপিকে ৫০–এর নীচে নামাতে হবে।’

    বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট এখনও ঘোষণা হয়নি। তবে ভোটের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে রাজ্যের শাসক–বিরোধী দুই শিবিরই। রবিবার রাজ্যের চার জায়গা থেকে ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’ শুরু করে দিয়েছে তারা। সোমবার বাং‍লার আরও পাঁচ প্রান্ত থেকে এই কর্মসূচির সূচনা হয়। সেই উপলক্ষেই এ দিন মথুরাপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার রায়দিঘিতে হাজির ছিলেন অমিত শাহ। সেখানে তিনি দুর্নীতিমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার জন্য বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের ডাক দেন। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দুর্নীতির জাল কতটা গভীর, তা বোঝাতে শাহ ব‍লে‍ন, ‘দেশের যে কোনও প্রান্তে বাংলার প্রসঙ্গ উঠলে একটা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের ইমেজ ভেসে ওঠে। আমি এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নীতির ফিরিস্তি শোনাতে এসেছি।’ এরপরেই তিনি একে একে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, মনরেগা দুর্নীতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তাঁর মতে, ‘এই সব দুর্নীতিকে যে ডিজিপি (রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার) আড়াল করেছেন এতদিন, তাঁকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছেন।’ তৃণমূলের কোন কোন নেতা–মন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগ জেলে খেটেছেন, তাঁদের নামের ফিরিস্তিও মথুরাপুরের সভামঞ্চ থেকে শোনান দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

    তবে দুর্নীতি প্রসঙ্গে মমতাকে আক্রমণের ফাঁকেই শাহ এ দিন বারবার টেনে আনেন অভিষেককে। এবং তাঁর রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে নামারকম ভবিষ্যদ্বাণীও করেন। শাহের দাবি, ‘বাংলার জনগণের মঙ্গল করা মমতার উদ্দেশ্য নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করে তাঁর সংযোজন, ‘উনি (মমতা) শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভালো করতে চান। অভিষেককে মুখ্যমন্ত্রী বানাতে চান।’ এরপরেই বিভিন্ন বিজেপি বিরোধী দলে পরিবারতন্ত্র কী ভাবে কয়েম হয়েছে, তা বোঝাতে শাহের মন্তব্য, ‘তেজস্বী যাদব লালুপ্রসাদ যাদবের ছেলে। অসমের গৌরব গগৈ তরুণ গগৈয়ের ছেলে। করুণানিধির ছে‍লে স্ট্যালিন। বালা সাহেব ঠাকরের দলেও ভরপুর পরিবারতন্ত্র। বাংলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো।’ তাঁর মতে, বাংলার অন্য কোনও যুবক তৃণমূলে এই জায়গা পাবেন না। শাহের আশ্বাস, ‘আপনাদের গুরুত্ব শুধু নরেন্দ্র মোদীর দলেই থাকবে। বিজেপি–ই একমাত্র দল যারা পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি করে না।’ তৃণমূল অবশ্য এর জবাব দিতে দেরি করেনি। দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা এবং তাঁদের বাবার ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘ভণ্ডামিরও একটা সীমা থাকে! বঙ্গের তথাকথিত পরিবর্তন যাত্রা থেকে যখন তারা (বিজেপি) পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগছে, তখন একবার নিজেদের ফুলে-ফেঁপে ওঠা মোদী কা পরিবার-এর ভিতরটা দেখলেই হয়।’ তবে তৃণমূলের পোস্ট করা বিজেপির ‘পরিবারতন্ত্রের’ তালিকায় সচেতন ভাবেই অমিত শাহের ছেলে জয় শাহের ছবি রাখা হয়নি। সেটার ইঙ্গিত করে ওই পোস্টে তৃণমূলের কটাক্ষ, ‘আমরা ইচ্ছে করেই সবচেয়ে বড় নামটা বাদ রেখেছি। যিনি কোনও যোগ্যতা ছাড়াই ক্রিকেট প্রশাসক হয়ে গিয়েছিলেন। আপনার অনুমান কমেন্টে জানান।’

  • Link to this news (এই সময়)