• ইরানে আটকে বসিরহাটের আমির, কাশ্মীরের পড়ুয়া, আতঙ্কে দিন কাটছে পরিবারের
    এই সময় | ০৩ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, বসিরহাট ও কলকাতা: আতঙ্ক আর উদ্বেগ যেন মিলিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটের আমির হোসেন আর জম্মু–কাশ্মীরের শ্রীনগরের সোবিয়া খানের পরিবারকে। ইজ়রায়েল–ইউএসএ ইরানের উপরে হামলা চালানোর পর থেকেই গোটা পশ্চিম এশিয়ায় এখন কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতি। পাল্টা মিসাইল অ্যাটাক শুরু করেছে তেহরানও। এই আবহে ইরানের বিভিন্ন শহরে কেউ পড়াশোনা, কেউ বা কাজের খোঁজে গিয়ে আটকে পড়েছেন। আর এ দেশে তাঁদের পরিবার রয়েছেন রীতিমতো দুশ্চিন্তায়।

    উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট–১ ব্লকের শাঁকচুড়া–‌বাগুন্ডি পঞ্চায়েতের মাঠপাড়া গ্রামের আমির হোসেন গাজি বছর আটেক আগে পড়াশোনা করতে ইরানে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেখানেই শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন তিনি। আমিরের সঙ্গেই ইরানের কোম শহরে থাকেন তাঁর স্ত্রী উষা পারভিন, দুই পুত্র ও এক কন্যা। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির কথা সংবাদমাধ্যমে জেনে ছেলের চিন্তায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা মা ইয়ারবানু বিবি। প্রবল উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন দাদা সাইন গাজি, ভাই সাবির গাজি। রবিবার থেকে বেশ কয়েকবার মোবাইলে চেষ্টা করেও আমিরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। তবে গভীর রাতে মুম্বইয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়ির এক সদস্যকে ফোন করতে পেরেছিলেন আমির, এমনটাই জেনেছেন সাইনরা। ইয়ারবানু সোমবার বলেন, ‘আমার ছেলে ওখানেই চাকরি করে। বৌমা–নাতিপুতিদের নিয়ে থাকে। দু’দিন ধরে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আমি ভারত সরকারের কাছে চাইব, আমার ছেলে ও তার পরিবারকে সুস্থ শরীরে দেশে ফিরিয়ে আনতে।’

    যুদ্ধবিধ্বস্ত তেহরানের একটি হস্টেলের ঘরে কার্যত বন্দি শ্রীনগরের ১৮ বছরের এক ডাক্তারি-পড়ুয়া সোবিয়া খান। সূত্রের দাবি, সেখানে আটকে পড়েছেন সোবিয়ার মতো ভারতের ১২০০-রও বেশি পড়ুয়া। সোবিয়ার দাদা আলতাফ সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ওর সঙ্গে একেবারেই যোগাযোগ করতে পারছি না। রবিবার সকাল ৮টা নাগাদ কোনওরকমে এক-দু’মিনিটের জন্য লাইনে পেয়েছিলাম। ও শুধু কাঁদছিল। বলছিল, অনবরত বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ নেই, মা সারাক্ষণ কাঁদছেন। আমাদের রাতের ঘুম উড়েছে। এখন বিদেশ মন্ত্রক এবং ভারত সরকার দ্রুত ওদের উদ্ধার করবে, সেই আশাতেই দিন গুনছি আমরা।’

    জম্মু ও কাশ্মীর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ইরান কো-অর্ডিনেটর তথা তৃতীয় বর্ষের এমবিবিএস ছাত্র ফয়জান নবি জানালেন, তিনি দিন তিনেক আগে দেশে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু পরীক্ষা থাকায় অনেকেই সেখানে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আটকে পড়া এই ১২০০ পড়ুয়ার মধ্যে জম্মু–কাশ্মীর, পাঞ্জাব, কেরালা-সহ দেশের নানা প্রান্তের ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। ২৩ বছরের আফনান অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে হস্টেলের বেসমেন্টে আশ্রয় নিয়েছেন।

    তাঁর ভাই ফারহান পারায়ের কথায়, ‘শনিবার শেষ কথা হয়েছিল, কিন্তু প্রবল ডামাডোলের মাঝেই লাইন কেটে যায়। তারপর থেকে ওর সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করা যায়নি।’ আটকে পড়া ২০ বছরের আর এক ছাত্রীর মা আফরোজাও ভাগ করে নিলেন তাঁর যন্ত্রণার কথা। তাঁর মেয়ে আরাক ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এ এমবিবিএস করছেন। আফরোজার কথায়, ‘ভোর ৫টা নাগাদ ও ফোন করেছিল। বেশি কথা বলতে পারেনি। শুধু জানাল, হস্টেলের ডর্মেই আছে। ওখানকার সব ইন্টারনাল অ্যাপ নাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৫-২০ জন ভারতীয় পড়ুয়া আটকে রয়েছে ওখানে। আরও কয়েকজনের সঙ্গে ফেরার টিকিটও বুক করেছিল ও, কিন্তু এগজ়িট ভিসা না থাকায় বেরোতে পারেনি।’

    আফরোজা আরও বলেন, ‘ওদের কাছে খাবারও বাড়ন্ত। সোমবার পর্যন্ত চলার মতো রসদ ছিল, কিন্তু এখন প্রাণভয়ে খাবার জোগাড় করতে বাইরেও বেরোতে পারছে না। হস্টেলের ওয়ার্ডেন আছেন কি না বা ওদের দেখাশোনা করার কেউ আছে কি না, তা-ও আমরা জানি না।’

  • Link to this news (এই সময়)