এই সময়: ‘মনচুরি’ সিনেমায় পকেটমারির স্কুল খুলেছিলেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। সেখানে ছাত্র হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। আদতে অভিনয় হলেও সিনেমায় দেখানো হয়েছিল, একজন দক্ষ পকেটমার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সেই যুগ কবেই গিয়েছে! আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় পকেটমারি পেশাটাই এখন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। এরই মধ্যে টিমটিম করে জ্বলছেন কয়েকজন। এমনই ছ’জনের একটি দলের হদিশ পেলেন বিধাননগর ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানার পুলিশ কর্মীরা।
একটা সময়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ টাকা ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাতেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। ফলে, এখন স্ট্র্যাটেজি পালটে পকেটমাররা হয়ে গিয়েছেন ‘লিফটার।’ অনেকেই দু’আঙুলের নিখুঁত ছোঁয়ায় পকেট কিংবা ব্যাগ থেকে তুলে নিচ্ছেন মোবাইল ফোন। আর মানিব্যাগ হাতে এলে দেখে নিচ্ছেন তাতেও নগদ রয়েছে, নাকি কার্ড।
দু’যুগ আগে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড বাজারে এসেছিল। আর তাতেই জোর ধাক্কা খায় পকেটমারির পেশা। পকেট থেকে কার্ড তুলে নিলেও পাসওয়ার্ড দেবে কে? ফলে, দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় থাকা ওস্তাদরাও কুপোকাত হয়ে যান আধুনিক ব্যবস্থায়। প্রায় সকলেই নাম লেখান ‘লিফটার’–দের দলে।
২০১৬–র নভেম্বরে নোটবন্দির ঘোষণার পাশাপাশি ‘ডিজিটাল’ ইন্ডিয়ার কথা ঘোষণা করেন নরেন্দ্র মোদী। অনলাইন ব্যবস্থায় পেমেন্ট সিস্টেম চালু হওয়ায় ‘ব্যাকডেটেড’ হয়ে যায় ডেবিট, ক্রেডিট কার্ডও। কিন্তু ব্যাঙ্কগুলি ‘কন্টাক্টলেস’ বা ‘ওয়াই-ফাই’ যুক্ত কার্ড বাজারে আনার পরে ফের উৎসাহিত হয়ে ওঠেন পকেটমারেরা। ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ প্রযুক্তির হাত ধরে টাকা হাতানোর কৌশল নেন তাঁরা।
পুলিশের দাবি, মাসের শুরুতে পকেটে নগদ রাখলেও পরবর্তীতে সামান্য কিছু টাকা হাতে রাখা লোকজনের সংখ্যা এখন অনেকটাই বেশি। আর মাসভর জিনিস কিনতে কিংবা বিভিন্ন ধরনের বিল মেটাতে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ‘বিশ্বস্ত’ সঙ্গী। আধুনিক সেই কার্ডগুলিতে থাকা ‘কন্টাক্টলেস’ লেনদেনের সুবিধাকেই এখন হাতিয়ার করছে পকেটমারেরা। ওই কার্ডগুলি ‘ওয়াই-ফাই’ যুক্ত মেশিনে ছোঁয়ালে ৫–১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা সম্ভব, এর জন্য কোনও পিন বা পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন হয় না। সেই সুযোগের ফায়দা তুলতে অপরাধীরা ভিড় বাসে কৌশলে মানিব্যাগ হাতিয়ে নিচ্ছেন। তারপর কার্ড ব্লক হওয়ার আগেই পিওএস মেশিনের মাধ্যমে দফায় দফায় সরিয়ে ফেলছেন টাকা।
বিশেষ সূত্র মারফত খবর পেয়ে সোমবার সল্টলেকের সেক্টর ফাইভ সংলগ্ন কলেজ মোড়ে চলন্ত বাস থেকে এমনই এক পকেটমার চক্রের ছয় পাণ্ডাকে পাকড়াও করেছে বিধাননগর ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম সবুজ শেখ (২১), আমিরুল লস্কর (২৪), বাবর আলি মণ্ডল (২৪), অহিদুল ইসলাম লস্কর (১৮), সালাউদ্দিন শেখ (২২) এবং রমজান শেখ (২৫)। এই চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত বলে দাবি পুলিশের। ধৃতদের জেরা করে বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে বলে জানিয়েছেন বিধাননগর কমিশনারেটের এক কর্তা।