• অভিষেকের বক্তব্যে বাম সুর, তৃণমূলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জল্পনা
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৫ মার্চ ২০২৬
  • গত কয়েক মাসে একাধিক ঘটনায় সেই প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দুই সমকামী তরুণীর বিবাহ উপলক্ষে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ফোনে শুভেচ্ছা জানান অভিষেক। পরে রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রার্থী হন সুপ্রিম কোর্টে সমকামী অধিকারের মামলার অন্যতম আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সামাজিক ন্যায় ও অধিকারের প্রশ্নে স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন।

    ফেব্রুয়ারিতে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি কবিতায় রাষ্ট্র ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার করেন অভিষেক। সংসদে বাজেট আলোচনার শেষে তিনি উদ্ধৃত করেন কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের সুপরিচিত পঙ্‌ক্তি, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদী রাজনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই উদ্ধৃতি রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

    রাজ্য বাজেট ঘোষণার পর দলীয় প্রচারে নানা সামাজিক প্রকল্প গুরুত্ব পেলেও, অভিষেক বিশেষভাবে তুলে ধরেন ভূমিহীন কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের আর্থিক সহায়তা এবং কৃষকদের বিনামূল্যে সেচের জলের বিষয়টি। বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী, রাজ্যের ভূমিহীন ক্ষেতমজুররা বার্ষিক ৪,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। সেই সঙ্গে সাড়ে ২২ লক্ষ কৃষকের জন‍্য বিনামূল্যে চাষের জল সরবরাহ করা হবে। সবমিলিয়ে, দু’টি সিদ্ধান্তে রাজ‍্যের প্রায় ৭০ লক্ষ কৃষক উপকৃত হবেন।

    এখানেই বাম শাসনের চিন্তাধারার সঙ্গে একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের শ্রেণিভিত্তিক এই দৃষ্টিভঙ্গি একসময় যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে গুরুত্ব পেয়েছিল, যখন হরেকৃষ্ণ কোঙার ক্ষেতমজুর আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়ে ক্ষেতমজুরদের জন্য এমন কর্মসূচি গ্রহণের পুরোধা ছিলেন তিনি।

    সম্প্রতি এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ওই যুদ্ধে জোসেফ স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত বাহিনীর ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি প্রতিরোধের উদাহরণ দেন। আবার এক সভায় বক্তৃতার শেষে উদ্ধৃত করেন সঙ্গীতশিল্পী সলিল চৌধুরীর গান, যা পশ্চিমবঙ্গের বাম আন্দোলনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।

    রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ধারাবাহিকতার মাধ্যমে অভিষেক একটি বৃহত্তর সামাজিক ও মতাদর্শগত পরিসরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার মন্তব্য করেছেন, বাম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে এনে রাজনৈতিক পরিসর বিস্তারের প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রশান্ত রায় মনে করেন, এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক বার্তা, যার লক্ষ্য নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক।

    রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিসরকে আরও ব্যাপ্ত করার লক্ষ্যে অভিষেক এই রাজনৈতিক নীতি নিয়েছেন। বিশেষ করে সম্প্রতি সিপিআইএম-এর যুবনেতা প্রতীক-উর রহমানকে তৃণমূলে যুক্ত করার মধ্যেও সেই ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ প্রতীক-উর রহমানকে দলে যুক্ত করার দিন দলের মতাদর্শ ব্যাখ্যা করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘অনেকে বিদ্রুপ করে বলেন, তৃণমূলের মতাদর্শ কী? আমি বলছি, তৃণমূলের মতাদর্শ ‘ওয়েলফেয়ারিজম’ (অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া)।’

    এখানেও বামপন্থীদের সঙ্গে চিন্তাধারার একটি মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কারণ সিপিএম যখন রাজ্যে রাজ্যে সরকার গঠনের জন্য সমাজবদলে বিপ্লবী কর্মসূচির লাইন নিয়েছিল, তখনও সাধারণ মানুষকে ‘রিলিফ’ বা স্বস্তি দেওয়ার কথাই বলা হয়েছিল। সেই সমাজব্যবস্থায় একটি অঙ্গরাজ্যে সরকার গঠন করলে ব্যবস্থার বদল না হলেও মানুষকে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে যথাসম্ভব স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হবে বামপন্থীদের ধারণা ছিল।

    যদিও তৃণমূলের তরফে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, সামাজিক ন্যায়, সাম্য ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারের প্রশ্নে দল বরাবরই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার চাপ বাড়ছে সব দলের উপরেই। এই প্রেক্ষাপটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনীতির সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নজরে রাখছে রাজনৈতিক মহল।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)