• রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান নিয়ে স্পষ্ট বার্তা রাজ্যের
    আজকাল | ০৮ মার্চ ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরবঙ্গ সফরে এসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মন্তব্যকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা শনিবার আরও নতুন মোড় নিল। রাজ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শিলিগুড়ির যে অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি যোগ দিয়েছিলেন সেটি ছিল একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগ, এবং সেখানে প্রোটোকল ভাঙার কোনও ঘটনা ঘটেনি। পাশাপাশি এই ইস্যুতে বিজেপির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির পদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে।

    প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘ইন্টারন্যাশনাল সান্তাল কাউন্সিল’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন শিলিগুড়িতে নবম আন্তর্জাতিক আদিবাসী সাঁওতাল সম্মেলনের আয়োজন করে। সেই সম্মেলনেই প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

    তবে অনুষ্ঠান ঘিরে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশাসনের কিছু উদ্বেগ ছিল বলে জানা গিয়েছে। ‘অ্যাডভান্সড সিকিউরিটি লিয়াজো’ বৈঠকের পর দার্জিলিং জেলা প্রশাসন লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে জানায় যে আয়োজকদের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। শুধু লিখিতভাবে নয়, টেলিফোনেও সেই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল বলে প্রশাসনের দাবি।

    পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের একটি দল ৫ মার্চ অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শনে আসে। সেখানেও আয়োজনের ঘাটতির বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়। তবুও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কর্মসূচি বহাল রাখা হয়।

    প্রশাসনের দাবি, রাষ্ট্রপতির সফরসূচি অনুযায়ী সব প্রোটোকল মেনেই তাঁকে স্বাগত জানানো হয়েছে। শিলিগুড়ি পুরনিগমের মেয়র, দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক এবং শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান এবং বিদায়ও জানান। এই তালিকাটি রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকেই অনুমোদিত ছিল বলে জানানো হয়েছে।

    প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বাগত জানানো বা মঞ্চে থাকার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। ফলে প্রোটোকল ভাঙার প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যার মধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। রাজ্যের শাসকদলের তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রপতির পদকে ব্যবহার করছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

    উল্লেখ্য, শনিবার শিলিগুড়ির কাছে গোঁসাইপুরে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু মন্তব্য করেছিলেন যে, হয়তো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপর রাগ করেছেন বলেই তাঁকে স্বাগত জানাতে আসেননি। তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার ছোট বোনের মতো। আমিও বাংলার মেয়ে। হয়তো তিনি রাগ করেছেন। তবে এতে আমার কোনও রাগ নেই।”

    রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। শনিবার সন্ধ্যায় ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে তার জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু তাঁকে দিয়েও রাজনীতি করানো হচ্ছে। বিজেপির এজেন্ডা নিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছে। আমি দুঃখিত ম্যাডাম, কিন্তু আপনি বিজেপির ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন।”

    মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, গোঁসাইপুরের অনুষ্ঠানটি কোনও সরকারি অনুষ্ঠান ছিল না এবং সেই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তাঁর কথায়, “প্রতিদিন যদি কেউ না কেউ আসেন, সব সময় কি আমাদেরই যেতে হবে? আমাদের তো কাজকর্মও আছে।”তিনি দেশের অন্যান্য রাজ্যে আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের ঘটনাও তুলে ধরেন। মণিপুর, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সেই সময় রাষ্ট্রপতি কেন কোনও প্রতিবাদ জানাননি।

    অন্যদিকে, একই দিন ধর্মতলায় চলা ধর্না মঞ্চ থেকে আরও একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। এই ধর্না থেকেই তিনি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদের ডাক দেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন মহিলাদের কালো শাড়ি পরে হাঁড়ি, কড়াই, হাতা ও খুন্তি নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

    সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির সফর, প্রশাসনের ব্যাখ্যা এবং মুখ্যমন্ত্রীর পাল্টা প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে গড়ায়, তার দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
  • Link to this news (আজকাল)