রাষ্ট্রপতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখন রাজনৈতিক ইস্যু
আজকাল | ০৯ মার্চ ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরবঙ্গ সফরে এসে রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শিলিগুড়ির কাছে গোঁসাইপুরে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, হয়তো মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ওপর রাগ করেছেন বলেই তাঁকে স্বাগত জানাতে আসেননি।
এই ঘটনাকে ঘিরে তোলপাড় হয়েছে রাজ্য রাজনীতি। এমনকী, তীব্র বিরোধিতা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহও। শনিবার রাষ্ট্রপতির মন্তব্যের পর কলকাতায় ধর্নামঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, গোঁসাইপুরের অনুষ্ঠানটি কোনও সরকারি অনুষ্ঠান ছিল না এবং সেই বিষয়ে রাজ্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
তাঁর কথায়, ‘যদি বছরে একবার আসেন আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাব। কিন্তু যদি বছরে ৫০ বার আসেন, তাহলে কি আমাদের সব কাজ ছেড়ে তাঁদের পিছনে ঘুরতে হবে?’
মমতার কথায়, ‘‘আপনি কবে আসবেন, কবে যাবেন, সেই ইনফর্মেশন (তথ্য) আমরা পাই। সেই মতো চেষ্টা করি প্রস্তুতি নেওয়ার। কিন্তু রেগুলার যদি... কোনও দিন ‘এ’ আসছেন, কোনও দিন ‘বি’, কোনও দিন ‘সি’ আসেন, আমাদের কী কাজকর্ম নেই নাকি! সারা দিন আপনাদের লেজুড় হয়ে ঘুরে বেড়াব? না কি লাটাই নিয়ে ঘুরতে হবে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য?’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বছরে এক বার আসুন না, আপনাকে ‘রিসিভ’ করব। বছরে যদি পঞ্চাশ বার আসেন, আমার টাইম আছে এত? আমি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এসআইআরের জন্য ধর্নায় আছি। আপনার মিটিংয়ে যাব কী করে? কোনটা আমার প্রায়োরিটি? ইউ আর প্রায়োরিটি অফ বিজেপি। মাই প্রায়োরিটি ইজ পাবলিক। কোন সংগঠন ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আমি-ই জানি না।’
শনিবার সকালে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে রাষ্ট্রপতি মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের ছোট বোন বলেও উল্লেখ করেন। বলেন, ‘মমতা আমার ছোট বোনের মতো। আমিও তো বাংলারই মেয়ে। হয়তো রাগ করেছে আমার ওপর।’
রাষ্ট্রপতি আর বলেন, ‘হয়তো ভেবেছিলেন এখানে কেউ আসবে না। ভেবেছিলেন হয়তো রাষ্ট্রপতি আসবেন এমনিই ঘুরে চলে যাবেন। আমার কিন্তু কোনও রাগ নেই।’
এই ঘটনার পর রাজ্য সরকারের তীব্র বিরোধিতা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে এই ঘটনাকে “লজ্জাজনক এবং অভূতপূর্ব” বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্র এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী মানুষজন এই ঘটনায় ব্যথিত। রাষ্ট্রপতি নিজেও জনজাতি সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর প্রকাশিত বেদনা গোটা দেশের মানুষের মনে গভীর দুঃখের সৃষ্টি করেছে।”
প্রধানমন্ত্রী সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে দায়ী করে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রপতির প্রতি এই অসম্মানের জন্য রাজ্য প্রশাসনই দায়ী।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাঁওতাল সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও রাজ্য সরকার যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই পদের মর্যাদা সর্বদা রক্ষা করা উচিত।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একই সুরে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের আচরণ রাষ্ট্রপতির প্রতি অসম্মানজনক এবং তা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকেও অপমান করার সামিল।
অমিত শাহ বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার তাদের নৈরাজ্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে আবারও নিচে নেমে গেল। প্রোটোকলের প্রতি চরম অবহেলা দেখিয়ে তারা ভারতের রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেছে।”
এই ঘটনাকে তিনি তৃণমূল সরকারের ‘নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন’ বলেও উল্লেখ করেন। তবে এই অভিযোগের মধ্যেই পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন।
রাজ্য সরকারের সূত্রে জানানো হয়েছে, যে অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি যোগ দিয়েছিলেন সেটি কোনও সরকারি অনুষ্ঠান ছিল না। ‘ইন্টারন্যাশনাল সান্তাল কাউন্সিল’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন ওই সম্মেলনের আয়োজন করেছিল এবং তাদের আমন্ত্রণেই রাষ্ট্রপতি সেখানে গিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফরে কী কী ঘটেছে, স্থানবদল কেন করা হয়েছে, প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, সবটাই লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন্দ্রের তরফে। রবিবার সকালে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর কাছে রিপোর্ট চেয়ে নির্দেশিকা পাঠিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন।