শ্রমের স্বীকৃতি ছাড়া নারী দিবস অসম্পূর্ণ, মিছিল শহরে
আজকাল | ১০ মার্চ ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত শনিবার, অর্থাৎ ৭ মার্চ, নারী দিবসের কথা মাথায় রেখে কলকাতার রামলীলা ময়দান থেকে আয়োজিত হল নারী, ট্রান্স, কুইয়ারদের মিছিল। এই মিছিল রামলীলা ময়দান থেকে পার্ক সার্কাস ময়দান পর্যন্ত যায়। মিছিলেন অংশ নিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। প্রায় ২৫টির বেশি দাবি নিয়ে এই মিছিল আয়োজন করা হয়েছিল। মিছিলে অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন নারী অধিকার আন্দোলনের সংগঠন থেকে শুরু করে লিঙ্গ অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সংগঠনগুলি। এই মিছিলের থেকে প্রকাশিত ইশতেহারের গৃহ পরিচারিকাদের জন্য বিশেষ আইন চালু করা বা মেয়েদের জন্য কৃষিজমি রেজিস্ট্রেশনের ফি মকুব করার মতো একাধিক দাবি। পাশাপাশি, এই মিছিলে ফের মনরেগা চালু করার দাবিও তোলা হয়।
এই মিছিলের আয়োজকদের পক্ষ থেকে লিখিত আকারে এক বিবৃতিতে মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার কর্মী রত্নাবলী রায় লেখেন, 'আন্তর্জাতিক কর্মজীবী বা শ্রমজীবী নারী দিবসের প্রাক্কালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ আবার সামনে এসেছে। আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই সচেতনভাবে “শ্রমজীবী” শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। বলা হয় শুধু “নারী দিবস”। এই পরিবর্তনকে অনেকেই নিরীহ বলে মনে করেন। তবে, বাস্তবে এর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
“শ্রমজীবী” শব্দটি বাদ পড়লে নিম্নবর্গ ও খেটে খাওয়া নারীদের বাস্তবতা আড়ালে চলে যায়। তাদের পেশাগত চাহিদা, অনিশ্চিত কাজের পাশাপাশি একা হাতে ঘর সামলান ও বাইরের কাজও সমান তালে করে যাওয়া, এই চাপ আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ফলে নারী দিবসের আলোচনায় এক ধরনের অসম্পূর্ণতা তৈরি হয়।
নারীশ্রম সমাজের অপরিহার্য অংশ। সমাজের দৈনন্দিন চলাফেরায় নারীশ্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রম শুধু কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ির ভেতরকার গৃহশ্রমও, সমাজ ও অর্থনীতির একটি মৌলিক অংশ।
নারী বলতে শুধু জন্মপরিচয়ে নারীদের বোঝানো হয় এমনটা নয়। জন্মসূত্রে নারী, ট্রান্স এবং কুইয়্যার মানুষও এই শ্রম-জগতের অংশ। তবুও, শ্রমের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই শ্রমের কোনও মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। যেখানে মূল্য দেওয়া হয়, সেখানেও তা বাজারচলতি মূল্যের চেয়ে, পুরুষের জন্য নির্ধারিত মূল্যের কম। পাশাপাশি, কাজের নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতার প্রশ্নও বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়।
“শ্রমজীবী” শব্দ নিয়ে বিতর্ককে ঘিরে অনেক সময় একটি যুক্তি সামনে আনা হয়। বলা হয়, “শ্রমজীবী” শব্দ ব্যবহার করলে কি অন্য নারীরা এই উদযাপন থেকে বাদ পড়ে যান? কিন্তু, সমালোচকদের মতে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। লিঙ্গ পরিচয়ে একজন নারী, অথচ তিনি শ্রমজীবী নন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। তাদের কাজকে, কাজ হিসেবেই গণ্য করা হয় না। ফলে তাদের শ্রমের মূল্যও নির্ধারিত হয় না। এই অস্বীকৃতি তাদের শ্রমজীবী পরিচয়কে মুছে দিতে পারে না।
পেশাগত চাপ, অনিশ্চিত কাজ এবং অস্বীকৃত গৃহশ্রম মিলিয়ে নারীদের জীবনে তৈরি হয় তীব্র মানসিক চাপ। অনেক ক্ষেত্রেই এই চাপ দীর্ঘমেয়াদি অবসাদের রূপ নেয়। এর পাশাপাশি, শ্রমের স্বীকৃতি না থাকা, কম মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এছাড়া বহু ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের শ্রমের ফল থেকেও বঞ্চিত হন। এই অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক ক্লান্তি ও হতাশা বাড়িয়ে দেয়। প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা, অবমূল্যায়ন এবং অদৃশ্য শ্রমের বোঝা, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার নামে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অসংখ্য খেটে খাওয়া নারীও রয়েছেন। ফলে তাদের নাগরিক অধিকারই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সমালোচকদের মতে এই ঘটনা একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট করেছে।
সমাজ ও অর্থনীতির কাঠামো তৈরিতে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অপরিহার্য। তাদের শ্রমের ওপরেই মুনাফার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদের আহ্বান উঠছে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবসের মূল চেতনা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। শ্রম, অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এই দিবসের তাৎপর্য। তাই এই লড়াইকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকারও সামনে আসছে বিভিন্ন স্তর থেকে।'