পর্দায় প্রতিফলিত চলচ্ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই ওই দৃশ্যটির শ্যুটিং করার সময় ক্যামেরার আশপাশে, পেছনে-আড়ালে ঠিক কী ঘটেছিল। ঘটনা, দুর্ঘটনার ইতিবৃত্তগুলো অনুল্লেখিতই থেকে যায় বরাবর। যেমন থেকে যাবে প্রার্জুন মজুমদার পরিচালিত ‘এই শহরের গান’-এর শ্যুটিং চলাকালীন ছবির অন্যতম অভিনত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের আহত হওয়ার ঘটনাটি।
তখন দুপুর। শাসন বাড়ির অঞ্জলি কুঞ্জের দোতলার হলঘরে ছবির একটি দৃশ্যের শ্যুটিং চলছে। ক্যামেরার সামনে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও প্রিয়াঙ্কা সরকার ওরফে অনিকেত ও সৃজনী। ব্রেকফাস্ট টেবিলে খুনসুটি চলছে দু’জনের মধ্যে। অনিকেত তাড়া করে সৃজনীকে। দৌড়ে পালায় সৃজনী। এতক্ষণ ‘মনিটর’ শট চলছিল। এবার ফাইনাল টেক। তখনই ঘটল দুর্ঘটনা। ফাইনাল টেকে কয়েক পা দৌড়ে শ্যুটিং জোন থেকে বেরিয়ে প্রিয়াঙ্কা থমকে দাঁড়াতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। বাঁ পায়ের উরুর পেশি ধরে ককিয়ে উঠলেন প্রিয়াঙ্কা। যন্ত্রণায় কাহিল শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন অভিনেত্রী। সোফার কিনারা ধরে কোনো মতে নিজেকে সামলে নিলেও স্বাভাবিক ভাবে মেঝেতে পা রাখতে পারছেন না প্রিয়াঙ্কা। কী হবে তাহলে! উদ্বেগে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এদিকে শটটি আর একবার টেক করা দরকার। কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা থেকে গিয়েছে। অভয় দিলেন আহত অভিনেত্রী স্বয়ং। সমস্ত যন্ত্রণাকে মুখ থেকে মুছে ফেলে পাথরের গোল সেন্টার টেবিলে সামনে পজিশন নিয়ে দাঁড়ালেন প্রিয়াঙ্কা। অদ্ভুত মানসিক দৃঢ়তায় গোটা শটটি উতরে দিলেন অভিজ্ঞ অভিনেত্রী। লাঞ্চ ব্রেক দিলেন পরিচালক।
গুরতরভাবে জখম পা নিয়ে বাকি দিনটা শ্যুটিং করবেন কীভাবে? প্রায় ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ব্রেক শেষে মেকআপে হালকা টাচ দিতে দিতে প্রিয়াঙ্কা বললেন, ‘পরিচালক প্রার্জুন আর প্রযোজক আকাঙ্খা দু’জনেরই খুব অল্প বয়স। অনেক স্বপ্ন, উৎসাহ আর সততা সম্বল করে অত্যন্ত সীমিত অর্থে ছবিটা তৈরি করছেন। এখন আমি যদি শ্যুটিং-এর মাঝপথে বাড়ি ফিরে যাই, ওঁরা বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। এটা একটা অ্যাকসিডেন্ট। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব।’
নবীন পরিচালক ও প্রযোজকের প্রতি সহানুভূতিশীল পরমব্রতও। বললেন, ‘ওঁদের আন্তরিকতা আমায় মুগ্ধ করেছে। আমার মনে হয়েছে ওঁরা একটা আধুনিক ছবি বানানোর চেষ্টা করছেন। চরিত্রটিও অনেকটা আমার মতো। অনিকেত গ্রাফিক্স আর্টিস্ট। বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ। শিল্প সংস্কৃতির দিকে ঝোঁক আছে।’
বরানগরের বাসিন্দা প্রার্জুন নয়ডাতে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে বছর চারেক আগে ‘অন্তর্জাল’ নামে একটি ছবি করেছিলেন। ‘এই শহরের গান’ প্রার্জুনের দ্বিতীয় ছবি। শহরের তিন প্রান্তে বসবাস করা তিনটি জুটির তিন স্তরের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সুখ, অ-সুখের টানাপোড়েনই ছবির মুখ্য বিষয়। আত্মবিশ্বাসী প্রার্জুনের কথায়, ‘তিনটি সম্পর্কের সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণতাগুলোর মধ্যে ভালোবাসার ভূমিকা কতটা, এবং সেই সহাবস্থানে এই শহর ওদেরকে তথা আমাদের সবাইকে একটা নিজস্ব সুরে কীভাবে বেঁধে রেখেছে, সেটাই বলার চেষ্টা করছি।’ ছবির বাকি দুই জুটির অভিনেতারা হলেন অনির্বাণ চক্রবর্তী ও কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অঙ্গনা রায় ও মনপ্রীত রহোতাস নিম্বিওয়াল (নবাগত)। ছবিটি এ বছরই মুক্তি পেতে পারে।