• রুদ্র-বাউলে এক অন্য চর্যা
    এই সময় | ১০ মার্চ ২০২৬
  • পার্বতী বাউলের গানের সঙ্গে সংলাপ বাহাউদ্দিন ডাগরের রুদ্রবীণার। শহরে অভিনব এই অনুষ্ঠান কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটির উদ্যোগে, ১২ মার্চ। ক্যাচলাইন ‘রুদ্র যোগিনী: মিস্টিক্যাল পোয়েট্রি মিটস রুদ্র’। রুদ্রবীণার ঝংকারে থাকবেন বাহাউদ্দিন ডাগর, কণ্ঠ আর একতারায় পার্বতী বাউল একতারাও তো বীণা। পুরোনো কালে তাকে বলত একতন্ত্রী বীণা। প্রাচীন বইপত্রে যে ‘একতন্ত্রী বীণা’-র কথা আছে, সে তো আসলে তারযন্ত্রের প্রথম চেহারা। লোকমুখে এই যন্ত্রটিই পরে হয়ে যায় ‘একতারা’। লাউয়ের একটা খোল, একটা বাঁশ আর মাত্র একটা তার— এরই মধ্যে সাত সুরের সাত সমুদ্র। তারযন্ত্রের এই সরল ধারণা থেকেই কিন্তু জন্ম নিয়েছে রুদ্রবীণার মতো জটিল বাদ্যযন্ত্র। একতারা যদি সব তারযন্ত্রের আদি হয়, রুদ্রবীণা তবে তার জমকালো রূপ। এই দুই বীণায় বেজে উঠবে চর্যাগীতির কথা আর সুর। চর্যাগীতি বাঙালির আদি কবিতা। সহজিয়া বৌদ্ধ সাধকদের গান। আর রুদ্রবীণা, পৌরাণিক বিশ্বাসে রুদ্র বা শিবের সৃজন। ধর্ম বা সঙ্গীতে যে-কোনও রকম সাম্প্রদায়িকতা ডিঙিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।

    চর্যাগীতির বীণায় গান ছিল। গানে ছিল বীণা। ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের যে চারটি শ্রেণি— তত (তারযন্ত্র), আনদ্ধ (পারকাসন, চামড়ার আচ্ছাদনযুক্ত), ঘন (ধাতুর তৈরি একে অপরে আঘাতে বাজে) এবং শুষির (ফুঁ দিয়ে বা বায়ুর চাপে বাজে)। তত যন্ত্রের মধ্যে একমাত্র বীণারই কথা চর্যাপদে পাওয়া যায়। ১৭ নম্বর পদে পাওয়া যায় গোপীযন্ত্রের মতো লাউয়ের খোলায় বাঁশের ডাঁটি লাগিয়ে তার সঙ্গে তাঁত বা তন্ত্রী জুড়ে তৈরি এক রকম বীণার কথা। সে পদের কবির নাম বীণাপাদ। পটমঞ্জরী রাগে সে গান বাঁধা। গানে বলছে, ‘সূর্য-লাউয়ে শশী লাগল তন্ত্রী, অনাহত দণ্ড— সব এক করে দিল অবধূতী। ওগো সখি, হেরুক বীণা বাজছে। শোন, তন্ত্রীধ্বনি কী করুণ সুরে বাজছে!’

    রুদ্রবীণার একদা প্রবল প্রচলন ছিল। মুঘল আমলের রবাবকে অনেকে রুদ্রবীণা-রই পরিবর্তিত রূপ মনে করেন। কিন্তু পরে রবাব থেকে সরোদ এবং সুরবাহার আর সেতারের মতো অপেক্ষাকৃত সহজ যন্ত্রের প্রচলনে রুদ্রবীণা হারিয়ে যেতে থাকে। সেতারে যেমন চটজলদি ‘তান’ বা ‘গৎ’ বাজানো যায়, রুদ্রবীণায় তেমনটা বেশ জটিল। রুদ্রবীণাকে ফিরে জাগিয়েছিলেন ডাগর পরিবার, উস্তাদ বাহাউদ্দিন ডাগর যে ঘরানার। গত শতকে তাঁর বাবা উস্তাদ জিয়া মহিউদ্দিন ডাগর সেই পুনরুজ্জীবনের অন্যতম কারিগর। রাজসভার ঐশ্বর্য যদি রুদ্রবীণাকে বলি তবে বাউল তো মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের প্রাণের কথা কান পেতে শোনা। তা-ই শুনতে চেয়েছিলেন মৌসুমী পরিয়াল। তাঁর পার্বতী বাউল হয়ে ওঠার গল্পটা ভালোবাসার গভীর সাধনা আর ত্যাগের গল্প। ছোটবেলায় শান্তিনিকেতনে শিল্পকলা নিয়ে পড়তে-পড়তে, ট্রেনে এক অন্ধ বাউলের একতারার সুরে মন চলে গিয়ে সে পথের পথিক হলেন। মেয়ে বলে প্রথমে ছিল বাধা। জেদ আর নিষ্ঠায় দূর করেছিলেন সে বাধা।

    সেই জেদ আর নিষ্ঠাই তো ছিল রুদ্রবীণার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকা গায়নশৈলী ধ্রুপদের আশ্চর্য গায়ক, তিনি বহরাম খানের। ধর্ম সেখানে কোনও বাধা হয়নি কখনও। কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুনিয়েছেন তাঁর গল্প, তিনি কাশীতে বারো বছর সংস্কৃত শিখে সঙ্গীতশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। তখনকার দিনে অব্রাহ্মণের সংস্কৃত শেখার অধিকার কাশীতে ছিল না। উনি পৈতে ধারণ করে কপালে চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে সন্ধ্যাহ্নিক করতেন কিন্তু মন্দিরে যেতেন না। এই ভাবে মতঙ্গ, ভরত শার্ঙ্গদেব ইত্যাদি ঋষিতুল্য সঙ্গীত শাস্ত্রকারদের প্রাচীন সঙ্গীত বিষয়ক শাস্ত্রাদি সংস্কৃতজ্ঞ গুরুর সাহায্যে বারো বছর ধরে অধ্যয়ন করে কাশী ত্যাগ করার সময় উনি মুসলমান বলে নিজের পরিচয় দেন এবং গুরুর পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এর জন্য ওঁকে গুরুর ব্রহ্মশাপ পেতে হয়নি। উপরন্তু গুরু ওঁকে প্রাণখুলে আশীর্বাদ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন যেন বহরাম খাঁ ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ গায়কদের মধ্যে আসন নিতে পারে। আজকের ভারতের সাধনায় নানা সুরের সেই আকুল ধারার মিলে যাওয়াটা খুব জরুরি। ‘রুদ্র-যোগিনী’ সে পথেই একটা অভিনব উদ্যোগ। পার্বতী বাউলের কথায়, ‘চর্যাগীতিতে রাগের চেয়ে কথার মাধ্যমেই সহজানন্দকে বোঝা যায় বেশি। তারই সন্ধানে আমার এই যাত্রা, উস্তাদজির সঙ্গে।’
  • Link to this news (এই সময়)