• শুধু ইঞ্জেকশনেই নয়, ভারতের বাজারে ইনসুলিন এ বার ইনহেলারেও
    এই সময় | ১৮ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: ডায়াবিটিস চিকিৎসায় এ বার নতুন দিগন্তের খোঁজ মিলল দেশে। ভারতের বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা সিপলা দেশীয় বাজারে নিয়ে এল আফ্রেজ়া— এক অভিনব ছুঁচবিহীন ইনসুলিন ইনহেলার। যা আগামী দিনে প্রচলিত ইঞ্জেকশন–নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডায়াবিটিসের চিকিৎসায়, বিশেষত ছোটদের টাইপ–১ ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে এই আফ্রেজ়া এক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত মাইলফলক হয়ে উঠতে চলেছে। প্রস্তুতকারক সংস্থার দাবি, এটি বিশ্বের একমাত্র দ্রুত কার্যকরী বা র‍্যাপিড–অ্যাক্টিং ইনসুলিন যা ইনহেলার হিসেবে প্রশ্বাসের মাধ্যমে নেওয়া যায়। ফলে লাগাতার প্রতিদিন একাধিক বার ইনসুলিন নেওয়ার ক্ষেত্রে ছুঁচের ব্যবহার থেকে মুক্তি মিলবে।

    আফ্রেজ়া আসলে ড্রাই পাউডার ইনসুলিন। যা একটি ছোট হ্যান্ড হেল্ড ইনহেলার ডিভাইসের মাধ্যমে নেওয়া যায়। রোগী শুধু ইনহেলারে হিউম্যান ইনসুলিনের কার্ট্রিজ় বসিয়ে শ্বাসের সঙ্গে পাফ টেনে নিলেই ইনসুলিন শরীরে মধ্যে ঢুকে যাবে। প্রয়োজন পড়বে না কোনও ইঞ্জেকশনের। ভারতীয় বাজারে একটি ইনহেলার–সহ চারটি কাট্রিজ় প্যাকের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা ম্যাক্সিমাম রিটেল প্রাইস (এমআরপি) ৩,৯৯৯ টাকা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সদ্য বেরিয়েছে বলে দাম সামান্য বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু আগামী দিনে দাম কমার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

    চিকিৎসকদের মতে, এই প্রযুক্তি ইনসুলিন ডেলিভারির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, ইনসুলিন শরীরে দ্রুত শোষিত হয় এবং খাবার খাওয়ার সময়েই কার্যকরী হয়ে উঠে শরীরের স্বাভাবিক ইনসুলিন প্রতিক্রিয়ার কাছাকাছি কাজ করে। এই ইনসুলিন ডেলিভারিতে যে হেতু ছুঁচের কোনও ভূমিকা নেই, তাই এ নিয়ে মানসিক বাধা অনেকটাই কম থাকে রোগীর। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আশাবাদী প্রস্তুতকারক সংস্থা। এই উদ্ভাবনকে চিকিৎসকরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, কারণ ভারতে এখন ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের ক্ষেত্রে ইনসুলিন প্রয়োজন হলেও নিয়মিত নেওয়ার হার এখনও প্রত্যাশিত নয়।

    তাই কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশন (সিডিএসসিও) আফ্রেজ়াকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর তাকে বাজারজাত করতে খুব বেশি সময় নেয়নি সিপলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঞ্জেকশনের ভয় ও অস্বস্তি অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সেই জায়গায় ইনসুলিন ইনহেলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা আপাতত প্রাপ্তবয়স্কদের টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য। প্রস্তুতকারক সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, এই উদ্ভাবন শুধু চিকিৎসাকে সহজ করবে না, রোগীদের মধ্যে নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

    প্রবীণ এন্ডোক্রনোলজি বিশেষজ্ঞ সতীনাথ মুখোপাধ্যায় অবশ্য মনে করেন, এখন না হলেও আগামী দিনে ‘পেডিয়াট্রিক ইউজ়’–এর কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র মেলার পরে আফ্রেজ়ার মতো ওষুধ টাইপ–২ ডায়াবিটিস রোগীদের পাশাপাশি টাইপ–১ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত শিশুদের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। যাঁদের প্রতিবার খাবার খাওয়ার সময় দিনে একাধিক বার ইনসুলিন নিতে হয়, কিন্তু ইনসুলিন পাম্পের খরচ বহন করা সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য ইনসুলিন নেওয়ার বিষয়টা খুব সহজ হয়ে উঠবে। তবে তাঁর আরও বক্তব্য, ‘যেহেতু আফ্রেজ়া মূলত খাবারের পরে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি (পোস্ট–মিল গ্লুকোজ় স্পাইক) নিয়ন্ত্রণ করে, তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ইনহেলারের পাশাপাশি একটি বেসাল (দীর্ঘমেয়াদি কার্যকরী) ইনসুলিনের প্রয়োজন থাকবেই।’

    পাশাপাশি চিকিৎসকরা এ কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোনও কোনও রোগীর ক্ষেত্রে ইনহেলারের মাধ্যমে বেশি মাত্রার ইনসুলিন নেওয়াটা চ্যালেঞ্জ মনে হতে পারে। আবার অ্যাজ়মা কিংবা সিওপিডি–র মতো শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার শিকার যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রেও আফ্রেজ়ার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)