রুপোলি পর্দার ঝকঝকে তারকা নন, সংগঠনের ছোট-বড় কোনও নেতাও নন। ভোটের ময়দানে আনকোরা হলেও মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের উপরেই বাজি ধরেছে মা-মাটি-মানুষের দল। ১৭ মার্চ তৃণমূলের প্রকাশিত ২৯১ আসনের প্রার্থী তালিকায় রাজনীতির ময়দানে পরিচিত প্রার্থীর পাশাপাশি উঠে এসেছে বেশ কিছু ‘নতুন’ প্রার্থীর নামও। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি কেন্দ্রে সামনে এসেছে এমনই চমক। সেখানে এ বারের নির্বাচনের জন্য তৃণমূলের তুরুপের তাস রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ণালী ধাড়া। সংগঠনের দুঁদে কোনও নেতা নন, ২৬-এর বাজি জিততে কুলপি কেন্দ্রে জোড়ফুল শিবির আস্থা রেখেছে পরিচিত এই মহিলা মুখের উপরে।
২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পান তিনি। গৃহবধূ থেকে মহিলাদের চাষের জমিতে স্বনির্ভরতার দিশা দেখানো ৫১ বছর বয়সি বর্ণালীকে 'বিশিষ্ট চাষি' হিসেবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে সম্মানিত হন। সেই বর্ণালীই জোড়াফুল শিবিরের হাত ধরে নামলেন ভোট ময়দানে।
কাকদ্বীপ ব্লকের উত্তর চন্দ্রনগরের বাসিন্দা বর্ণালী পড়াশোনা করেছেন নিশ্চিন্দিপুর আরডি হাইস্কুলে এবং পরে প্রাইভেটে স্নাতক সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই তাঁর বিয়ে হয় মলয় কুমার ধাড়ার সঙ্গে, যিনি একসময়ে সারের দোকান চালাতেন। শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। একটা সময়ে সার-কীটনাশক বিক্রির প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে বর্ণালী পরিচিত হন আরও বিপুল সম্ভাবনার সঙ্গে।
বর্ণালীর রাজনীতির সঙ্গে এর আগে যোগ না থাকলেও তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক পটভূমিও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর শ্বশুর দিলীপ কুমার ধাড়া, দীর্ঘদিন কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দাদাশ্বশুর হংসরাজ ধাড়া ছিলেন কংগ্রেসের বিধায়ক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বর্ণালীর দুই শ্বশুরমশাইয়ের।
অন্যদিকে, বর্ণালীর বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক ছিলেন। তাঁর দুই পুত্র—একজন মেকানিক্যাল এবং অন্যজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিটেক ডিগ্রিধারী। সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও, এলাকার মহিলাদের নিয়ে মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন তিনি।
মহিলাদের নিয়ে বর্ণালী শুরু করেন অশ্বত্থতলা মহিলা জনকল্যাণ নামের একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীও। এখন তার সেক্রেটারি পদে রয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে এই স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করে মহিলাদের আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেন। চাষবাস থেকে শুরু করে হস্তশিল্প—বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি বহু মহিলাকে স্বনির্ভর করে তুলেছেন। তাঁর সব থেকে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে হলো সূর্যমুখীর বীজ উৎপাদন। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে পান মহিলা কিষাণ পুরস্কার এবং ২০২৫ সালে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে কৃষক সম্মান লাভ করেন। বর্তমানে শুধু সূর্যমুখীর বীজই নয়, জমিতে দাঁড়িয়ে শাকসব্জি-সহ একাধিক চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
কুলপির তৃণমূল প্রার্থী বর্ণালী জানিয়েছেন, ভোটে দাঁড়ানোর কোনও পরিকল্পনা তাঁর আগে ছিল না। তবে নতুন দায়িত্ব পাওয়ায় কাজের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করেন বর্ণালী। তাঁর লক্ষ্য, কুলপি ব্লককে আরও সবুজ করে তোলা, কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো এবং চাষবাসের মাধ্যমে স্বনির্ভরতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।