২৩ বছর বাদে দেশের ১০ রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আয়োজন। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায় জাতীয় রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে তড়িঘড়ি এই আয়োজনে সরব হন বিরোধীরা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভোটার তালিকায় এই নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। বিভিন্ন রাজ্যে বহু যোগ্য ভোটার এই প্রক্রিয়ায় বাদ গিয়েছেন বলে অভিযোগ। জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্টেও। SIR নিয়ে একাধিক মামলা বিচারাধীন আদালতে।
মূলত, ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত করতেই SIR বলে জানায় নির্বাচন কমিশন। নাম নথিভুক্ত করতে প্রথম পর্যায়ে ১২টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩টি নথির কথা উল্লেখ করে কমিশন। সেই ১৩ নথির একটি প্রমাণ হিসেবে দেখালেই ভোটার তালিকায় থাকবে নাম। এই প্রক্রিয়াতে নথি পরীক্ষা করে যাচাইয়ের মাধ্যমে ১০ রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকায় ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া। সেই যাচাই প্রক্রিয়ায় একাধিক রাজ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী সবথেকে বেশি মানুষের নাম বাদ পড়েছে যোগী রাজ্যেই। পিছিয়ে নেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাটও।
ভোটার তালিকায় নাম বাদ গিয়েছে চার কারণে-
২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে প্রথম শুরু হয় ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী অর্থাৎ Special Intensive Revision (SIR)-এর কাজ। এই প্রক্রিয়া চলে গত বছরের জুলাই-অগস্ট পর্যন্ত। প্রায় ৭৭,৮৯৫ জন Booth Level Officers (BLOs) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করেন। সেই তথ্য যাচাইয়ের পরে ৯৯.৮% এর বেশি ভোটারকে এই প্রক্রিয়া আওতায় আনা হয়। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যায়, বাদ গিয়েছে ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম। যা মোট ভোটারের ৭.৯%। নতুন তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭.৪২ কোটিতে। বিশেষ করে মহিলাদের নাম তুলনামূলক বেশি বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই রাজ্যে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন।
SIR-এর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর। এই পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরালা, গুজরাট, ছত্তিসগড়, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গোয়া, পুদুচেরি, আন্দামান ও নিকোবর এবং লাক্ষাদ্বীপে শুরু হয় ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনীর কাজ। খসড়া তালিকা (draft roll) পর্যায়ে দেখা যায় ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৬.৫ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩.৫ কোটি ভোটারকে ডিলিশনের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বাদ পড়া নামগুলির বেশিরভাগই মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটার, ডুপ্লিকেট এন্ট্রি বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ভোটার।
SIR-এ উত্তরপ্রদেশে পরিস্থিতি আরও চমকপ্রদ। খসড়া তালিকা পর্যায়ে প্রায় ২.৮৯ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও চূড়ান্ত তালিকায় এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবুও এই রাজ্যে SIR-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এ রাজ্যেও বিপুল পরিমাণে মহিলা ভোটারের নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক রভনীত রিনওয়া জানান, মোট ১ কোটি ৫৪ লক্ষ মহিলার নাম বাদ পড়েছে খসড়া তালিকা থেকে। হিসাব বলছে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০ লক্ষ বেশি নাম বাদ পড়েছে মহিলাদেরই। খসড়া ভোটার তালিকায় থাকা ১২ কোটি ৫৫ লক্ষের মধ্যে ৫.৬৭ কোটি মহিলা ভোটার। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬.৮৮ কোটি।
১৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটে প্রকাশিত হয় SIR-এর পরে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। সেখানে রয়েছে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ ৩০ হাজার ৭২৫ জন নাগরিকের নাম। মোদীর রাজ্যে বাদ পড়েছেন ৭৩.৭ লক্ষ ভোটার। মোট ভোটারের ১৮.৭% এই সংখ্যা বাকি রাজ্যের নিরিখে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
বাংলায় SIR প্রক্রিয়া নিয়ে সবথেকে বেশি অভিযোগ সামনে এসেছে। এ রাজ্যের শাসক দল এই প্রক্রিয়ায় একাধিক ক্রুটির অভিযোগ তুলে বার বার কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। এমনকী সুপ্রিম কোর্টেও বিচারাধীন এই মামলা। কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা থেকে ৬৩ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। পাশাপাশি আরও ৬০ লক্ষের বেশি নাম এখনও ‘under adjudication’, অর্থাৎ যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। SIR-এর আগে যেখানে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি, তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৪৪ কোটিতে। ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৪ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। সাপ্লিমেন্টারি লিস্টের মাধ্যমে বিচারাধীন তালিকা আরও কিছু নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা।
রাজস্থানে চূড়ান্ত তালিকায় ৩১.৩৬ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.১৫ কোটিতে। একই ভাবে মধ্যপ্রদেশে ৩৪.২৫ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে, ফলে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা ৫.৭৪ কোটি থেকে কমে ৫.৩৯ কোটিতে নেমে এসেছে। এই দুই রাজ্যেই শহরাঞ্চল ও নতুন বসতি এলাকায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে।
তামিলনাড়ুতে SIR-এর পরে চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী প্রায় ৯৭.৩৭ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। খসড়া পর্যায়েও প্রায় একই সংখ্যক নাম বাদ পড়েছিল। বিশেষ করে স্থানান্তরের কারণে বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
মধ্যপ্রদেশে চূড়ান্ত তালিকায় বাদ গিয়েছে ৪২.৭৪ লক্ষ ভোটারের নাম। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পরে এই রাজ্যে মূলত ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার হার বেশি। কমিশন সূত্রে খবর, ইন্দোর ও ভোপাল জেলায় নাম বাদের হার সবচেয়ে বেশি। মোট ভোটার সংখ্যা কমে ৫.৭৪ কোটি থেকে ৫.৩৯ কোটিতে নেমেছে।
ছত্তিসগড়ে বাদ পড়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ ভোটারের নাম। বর্তমানে এ রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১.৮৭ কোটি।
দক্ষিণের এই রাজ্যে ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার হার তুলনামূলক ভাবে কম। এ রাজ্যে চূড়ান্ত তালিকায় বাদ গিয়েছে ২৪.০৮ লক্ষ ভোটারের নাম, যা মোট ভোটারের ৩.২২ শতাংশ
এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনিউমারেশন ফর্ম না ফেরত দেওয়ার কারণে বাদ গিয়েছে প্রচুর নাম। SIR-এর পরে চূড়ান্ত তালিকায় বাদ গিয়েছে ১.০৩ লক্ষ ভোটারের নাম।
কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুসারে কেন্দ্র শাসিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মোট ভোটার সংখ্যা ২,৫৮,০৪০ জন, যার মধ্যে ১,৩০,৪১৫ জন পুরুষ, ১,২৭,৬২২ জন মহিলা এবং ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন। নাম বাদ পড়েছে ৫,২৬৯ জনের।
সামগ্রিক ভাবে, SIR ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ভোটার তালিকা সংশোধন অভিযান। বহু ক্ষেত্রে এখনও নাম যাচাইয়ের কাজ চলছে, ফলে চূড়ান্ত তালিকায় আরও পরিবর্তনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।