• যুদ্ধের জেরে গ্যাস নিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগের, মেনে নিল কেন্দ্র
    এই সময় | ২১ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: হেঁশেল নিয়ে দুশ্চিন্তা কমার কোনও লক্ষণই নেই। উল্টে সপ্তাহান্তে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যে রান্নার গ্যাস নিয়ে উদ্বেগ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। এলপিজি– (LPG) র সরবরাহ মোটের উপরে স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেও শুক্রবার কেন্দ্র মেনে নিল, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও যথেষ্ট 'উদ্বেগজনক'। এই অবস্থায় গ্রাহকদের যতটা সম্ভব পাইপ্‌ড ন্যাচারাল গ্যাস (পিএনজি) (PNG) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সরকার।

    ইরান বনাম ইউএস-ইজ়রায়েলের যুদ্ধ (IRAN VS USA-ISRAEL) সামরিক শক্তি প্রদর্শনের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিমধ্যেই আঘাত হেনেছে জ্বালানি ভাণ্ডারে। আর তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের জ্বালানি পণ্যের উপরেও। দেশে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।

    এই পরিস্থিতিতে দেশের যে সমস্ত এলাকায় পিএনজি পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে বেশি করে পাইপলাইনে গ্যাসের সংযোগ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক। শুধু তা–ই নয়, পিএনজি সরবরাহ রয়েছে এমন এলাকায় গ্রাহকদের এলপিজি সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করছে কেন্দ্র। মজুতদারি রুখতে রাজ্যগুলিকে আরও কড়া নজরদারি করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে, যাতে 'প্যানিক বুকিং'-এর কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

    এ দিন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের সচিব সুজাতা শর্মা জানান, এলপিজির উপরে চাপ কমাতে ইতিমধ্যেই ১৩,৭০০-র বেশি পিএনজি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'অনলাইন বুকিং-এর হার বেড়ে ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে এবং বৃহস্পতিবার, একদিনেই প্রায় ৫৫ লক্ষ রিফিলের আবেদন জমা পড়েছে।' সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমেরিকার মতো দেশ থেকে গ্যাসের বিকল্প আমদানির উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি জানিয়েছে, হরমুজ় প্রণালীর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় ভারত ক্রমশ বিকল্প উৎস হিসেবে আমেরিকার দিকে ঝুঁকছে।

    কেন্দ্রের পরস্পর–বিরোধী িববৃতি এবং সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত গ্রাহক থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউটরদের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে অটো এলপিজি–র দাম দু'বার বেড়েছে। বাণিজ্যিকের পাশাপাশি ইতিমধ্যে গেরস্থালির গ্যাসের দামও বেড়ে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি ২১ দিনের মাথায় আরও ঘোরালো হওয়ায়, শুক্রবার শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডিজ়েল ও প্রিমিয়াম পেট্রলের দাম বাড়িয়েছে তেল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি। গ্যাস সিলিন্ডার বুকিং নিয়ে যে ভাবে টানাপড়েন চলছে এবং কেন্দ্র বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলছে, তাতে গ্যাসের দামও আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইন্ডেন, এইচপি এবং ভারত গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলাররা।

    তাঁদের মতে, আমজনতা মূলত দু'টি কারণে গ্যাসের প্যানিক বুকিং করছেন। প্রথমত, যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে সিলিন্ডার সময়মতো সরবরাহে অনিশ্চয়তা। দ্বিতীয়ত, ইতিমধ্যে সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা দাম বেড়েছে। এত দিন ধরে যুদ্ধ চলার কারণে গ্যাস সরবরাহ যে স্বাভাবিক নেই, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ নিশ্চিত। ফলে আরও এক দফা দাম বাড়তে পারে ভেবেই অনেকে সিলিন্ডার বুকিং করছেন। অ‍ল ইন্ডিয়া এ‍লপিজি ডিস্ট্রিবিউটর ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিজন বিশ্বাস সহমত পোষণ করে বলেন, 'সিলিন্ডারের দাম বাড়ালে মানুষের প্যানিক বুকিংয়ে লাগাম পড়তে পারে। অবশ্য এখন পাঁচ রাজ্যে ভোট আসন্ন। এই পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ। সে ক্ষেত্রে ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ারআশঙ্কা রয়েছে।'

    ভারতের নিজস্ব উৎপাদন মোট চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ পূরণ করে, বাকি অংশ আমদানির মাধ্যমে আসে। এত দিন এই আমদানির সিংহভাগ আসত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ার উপরে নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে ভারত। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের মোট এলপিজি আমদানি কমে ২,৬৫,০০০ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে, যা ৫ মার্চ পর্যন্ত সপ্তাহে ছিল ৩,২২,০০০ মেট্রিক টন। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়া থেকে সরবরাহ মাত্র ৮৯,০০০ মেট্রিক টনে নেমে গিয়েছে, যা মোট আমদানির৩৪ শতাংশ। এর বিপরীতে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বেড়ে ১,৭৬,০০০ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের সপ্তাহে শূন্য ছিল। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জন্য আমেরিকা থেকে ২২ লক্ষ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সুরক্ষিত করেছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি সঙ্কট মোকাবিলার কৌশল নয়, বরং ভবিষ্যতে সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখাযেতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)