• অল্প বয়সেই জিহাদি তৈরির ছক! প্রশিক্ষণের জন্য ‘স্কুল’ গড়ছে জৈশ–লস্কর
    এই সময় | ২৩ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: পাকিস্তানের (Pakistan) মাটিতে জঙ্গি তৈরির ‘কারখানা’ রয়েছে, সে তথ্য নতুন নয়। একেবারে শৈশব-কৈশোরে বাড়ি থেকে তুলে এনে লস্কর-ই-তৈবা (Lashkar-e-Taiba) বা জৈশ-ই-মহম্মদের (Jaish-e-Mohammed) ক্যাম্পে মগজধোলাই এবং অস্ত্রচালনার ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এমন ট্রেনিং ক্যাম্পেরই ফসল ২৬/১১ মুম্বই হামলায় (26/11 Mumbai attacks) ধৃত আজমল আমির কাসভের মতো জঙ্গিরা। সম্প্রতি গোয়েন্দাদের হাতে রিপোর্ট এসেছে, পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে এই শিশু-কিশোরদের নিয়ে বিশেষ ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করেছে লস্কর এবং জৈশ। তবে এ বার একেবারে অন্য ধাঁচে।

    জঙ্গি ট্রেনিং ক্যাম্প নয়, কাগজে–কলমে ‘স্কুল’ তৈরি করে। পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) হালফিলে প্রচুর পোস্টার নজরে এসেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। সেখানে নির্দিষ্ট ভাবে ‘বোর্ডিং স্কুল’-এর কথা বলা হয়েছে। বিনাখরচে সেই স্কুলে বাড়ির শিশু এবং কিশোরদের পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে অভিভাবকদের কাছে। শুধু তা-ই নয়, গোয়েন্দা সূত্রের খবর, যে পরিবার থেকে পিওকে-র ‘স্কুল’-এ বাচ্চাদের পাঠানো হবে, সেই পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। মূলত ৭-১৩ বছরের শিশু-কিশোরদের ভর্তিতে জোর দিচ্ছে লস্কর এবং জৈশ। যারা ভর্তি হবে, তাদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া তো আছেই, সঙ্গে মাসিক ভাতা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে পোস্টারে। মূলত বাহওয়ালপুর, মুরিদকে, লাহোর এবং করাচিতে এই স্কুলগুলি খোলা হচ্ছে বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা।

    তাঁদের বক্তব্য, যে সময়ে এই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। গরিব ঘর থেকে রিক্রুট করা জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছে নতুন কিছু নয়। তবে এই সময়টা তাদের কাছে এমন সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে আগ বাড়িয়ে রিক্রুট করতে হচ্ছে না। নিজে থেকেই শিশু-কিশোরদের ‘স্কুল’–এ ভর্তি করছেন অভিভাবকরা। কারণ এই মুহূর্তে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক হাল রীতিমতো করুণ। এমনিতেই ঋণের ভারে ডুবে থাকা দেশে সাধারণ মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরনোর দশা ছিল। তার উপরে ইরান-ইজ়রায়েল-আমেরিকা যুদ্ধে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তেল নেই, টাকা নেই, চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। এমনকী বাজারে চাল-ময়দারও তীব্র আকাল। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, পাকিস্তানের দরিদ্র পরিবারগুলির কাছে এ হেন সঙ্কটে সন্তানের নিশ্চিত অন্নসংস্থানের জন্য এই ‘স্কুল’ একপ্রকার আশীর্বাদের মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

    গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ (Operation Sindoor) প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পিওকে-র জঙ্গি ক্যাম্পগুলিকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে লস্কর এবং জৈশ। সেখানে তাদের সাহায্য করছে পাক সেনা এবং গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। কিন্তু পিওকে-র কিছু জায়গায় পাক-বিরোধী স্বর ক্রমশ বাড়ছে। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, এখানে বিদ্রোহের স্বর দমন করতে দারিদ্রকে হাতিয়ার করছে আইএসআই এবং পাক সেনা। তাই পিওকে থেকে ‘স্কুল’-এ ছাত্র পাঠানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর।

    গোয়েন্দাদের দাবি, পিওকে-র একাধিক জায়গায় কাশ্মীর-বিরোধী স্লোগান এখন আর তেমন ভাবে কাজ করছে না। সেখানকার অনেকেই ‘কাশ্মীর-মোহ’ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বেশ কিছু জায়গায় পাক সেনা ঢুকতেও বাধা পেয়েছে। কনভয় তাক করে উড়ে এসেছে ঢিল-পাথর। মাঝপথ থেকে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে হয়েছে কনভয়কে। কোটলি, রাওয়ালকোট, মীরপুর বা ভীমবেড়ের মতো শহরে জনতা রীতিমতো সভা করে সেখান থেকে জঙ্গিদের ট্রেনিং ক্যাম্প তুলে নেওয়ার জন্য স্লোগান দিয়েছে। নিট ফল, পিওকে থেকে রিক্রুট করতে গিয়ে ধাক্কা খেতে হচ্ছে জঙ্গি সংগঠনগুলিকে। রিক্রুটমেন্টের সংখ্যাও দ্রুত কমছে। সে কারণেও পিওকে-র উপরে এই বিশেষ জোর।

    শুধু নিজেদের স্কুল খোলাই নয়, গোয়েন্দা সূত্রের খবর, পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে এ বার নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছেন লস্কর এবং জৈশ নেতৃত্ব। সেখানে তাঁরা ভারত-বিদ্বেষে ভরা বক্তব্য রাখছেন পড়ুয়াদের সামনে, জঙ্গিদের ‘জিহাদি’ বলে মহিমান্বিত করছেন। কাশ্মীরে নিহত জঙ্গিদের ছবি দেখিয়ে স্কুলে ‘গো অ্যাজ় ইউ লাইক’-এ সাজতে বলা হচ্ছে। কাশ্মীরকে সামনে রেখে দেওয়া হচ্ছে ‘জিহাদ’-এর পাঠ। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, স্কুলস্তর থেকে জঙ্গি তৈরির এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরে। সে কাজেই এখন গতি আনা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, লস্করের থেকে এই প্ল্যানে এগিয়ে রয়েছে জৈশ। লস্কর মূলত পিওকে-তে নিজেদের স্কুলগুলির উপরেই নজর দিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান জুড়ে স্কুলে স্কুলে এই ‘কারিক্যুলাম’ ছড়ানোর কাজটা করছে জৈশ। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ‘স্কুল’ তো আছেই।

  • Link to this news (এই সময়)