• হিমালয়ে দু’বছরের মধ্যে ৩৫০ বর্গকিমি অরণ্য আচ্ছাদন হ্রাস
    এই সময় | ২৩ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: অবস্থাটা ক্রমশ শাঁখের করাতের মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একদিকে দিন ও রাত — দু’দিকেরই গড় তাপমাত্রা বাড়ছে গোটা দেশে, অন্য দিকে হিমালয়ের অরণ্য অঞ্চলে (Forested areas of the Himalayas) কমছে সবুজের আচ্ছাদন। দুই মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ত্রিপুরা (Jammu and Kashmir to Tripura) পর্যন্ত ১৩টি রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা এমনিতেই বাড়ছিল আবহবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের। এমনই পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট (India State of Forests Report) (আইএসএফআর) ২০২৩ অনুযায়ী, অস্বস্তি আরও বাড়ল সবার।

    কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের (Forest, Environment And Climate Change Ministry) মন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং রাজ্যসভায় ওই রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে বৃক্ষ আচ্ছাদন ২০২১–এ ছিল ১৫ হাজার ৪২৭ বর্গ কিলোমিটার। কিন্তু ২০২৩–এ সেখান থেকে কমে হিমালয়ের সবুজ আচ্ছাদন ১৫ হাজার ৭৫ বর্গ কিলোমিটার হয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র দু’বছরে হিমালয়ের অরণ্য ৩৫২ বর্গ কিলোমিটার বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে। শতাংশের হিসেবে, ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে ভারতের হিমালয় অঞ্চল দু’শতাংশেরও বেশি অরণ্য আচ্ছাদন হারিয়েছে।

    ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলটি ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, অসম, অরুণাচলপ্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা। গত কয়েক বছর ধরেই এই রাজ্যগুলোর বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের পরিকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর–পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য এবং উত্তরাখণ্ড, হিমাচলপ্রদেশ এবং লাদাখে নানা ধরনের নতুন সড়ক তৈরি, নির্মাণ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পর কাজ নিয়মিত হয়ে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরাখণ্ডে ‘হৃষিকেশ বাইপাস’ এবং ‘গঙ্গোত্রী হাইওয়ে’–র মতো প্রকল্পর কাজও। এদের মধ্যে ‘গঙ্গোত্রী হাইওয়ে’ সম্প্রসারণের জন্য প্রায় সাত হাজার গাছ কাটার প্রয়োজন হবে বলে ইতিমধ্যেই ওই প্রকল্প নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

    উত্তরাখণ্ডকে প্রকৃতিগত কারণের জন্যই ‘ধসপ্রবণ’ বলে চিহ্নিত করেছেন ভূতত্ত্ববিদরা। এমন পরিস্থিতিতে মাটির বাঁধুনি ধরে রাখতে গাছের সংখ্যা যত বেশি থাকে, রাজ্যের জন্য ততই ভালো। কিন্তু তার পরেও গঙ্গোত্রী হাইওয়ে চওড়া করতে এত গাছ কাটা হবে কেন — এমন প্রশ্ন আদৌ অসঙ্গত নয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের মধ্যেই জোশিমঠ বসে যাওয়া থেকে শুরু করে উত্তরকাশীতে ভয়াবহ ভূমিধসের মতো ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়েছে।

    এর পাশাপাশি রয়েছে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম বৃষ্টির বিষয়টিও। পৃথিবী বিজ্ঞান মন্ত্রকের নতুন মূল্যায়নে দেখা গিয়েছে, ১৯০১ থেকে ২০১৮–র মধ্যে ভারতের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ১৯৮৬ থেকে ২০১৫–র মধ্যে উষ্ণতম দিনটির তাপমাত্রা ১৯৬৬–১৯৮৬ পর্যন্ত সময়সীমার চেয়ে প্রায় ০.৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতলতম রাতের তাপমাত্রা ওই সময়সীমার চেয়ে প্রায় ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অন্য দিকে, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৫০ মিমি-র চেয়ে বেশি বৃষ্টির ঘটনা ১৯৫০ থেকে ২০১৫–র মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পরেও উন্নয়নের নামে যে ভাবে হিমালয়ে বৃক্ষনিধন চলছে, তাতে উদ্বেগ বাড়ারই কথা। বৃষ্টির বিন্যাস থেকে শুরু করে মাটির বুনোট ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে পরিবেশরক্ষা — সব কাজের কাজি হলো গাছ। যদি সেই গাছই না থাকে তা হলে ভবিষ্যৎ পরিণতি উদ্বেগজনক হতে বাধ্য।

  • Link to this news (এই সময়)