গোপাল সাহা: কালের নিয়মে শীতের পর ঋতুরাজ বসন্ত আসে শেষবেলায়। আর এর পরেই আসে নতুন বছর, নতুন ঋতু গ্রীষ্ম। আর এই গ্রীষ্মের প্রাক্কালে বসন্তের হাত ধরে আবহাওয়ার নানা পরিবর্তন বা তারতম্যের কারণে নানা রোগের প্রকোপ মানুষের শরীরে দেয় প্রবল হাতছানি। জ্বর-সর্দি-কাশি-সহ বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগ থাবা বাসায় মানবদেহে। আক্রান্ত হয়ে পরে মানুষ নানা ভাবে। আর সেই কারণেই শহরে ফের কাশি-সর্দি ও জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। তবে আবহাওয়ার তারতম্যের পাশাপাশি শহরে অতিমাত্রায় পরিবেশ দূষণও এই অসুস্থতার বা সংক্রমণের একটা বড় কারণ বলে মনে করছেন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা। কলকাতায় হাজার হাজার মানুষ এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন এবং অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শুকনো কাশিতে ভুগছেন। অনেকের ক্ষেত্রে গলা ব্যথার সঙ্গে কণ্ঠস্বর বসে যাওয়ার সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি সুস্থ জীবনের জন্য অতিমাত্রায় প্রয়োজন বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন। তবেই এই সুস্থ জীবন সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা ওঠানামা করায় আবহাওয়া ভাইরাস ছড়ানোর জন্য অনুকূল হয়ে উঠেছে। এর ফলে অ্যাডেনোভাইরাস, রাইনোভাইরাস, মেটাপনিউমোভাইরাস ও এন্টারোভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এগুলি মূলত শ্বাসনালীর ওপরের অংশে সংক্রমণ ঘটিয়ে তীব্র কাশি ও গলা ব্যথার কারণ হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে শ্বাসনালীর প্রদাহের কারণে কণ্ঠস্বর ভেঙে যাচ্ছে।
এই বিষয়ে আরজি কর হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার চিকিৎসক তাপস প্রামানিক বলেন, “সম্প্রতি দীর্ঘদিন ধরে না সারা কাশির পেছনে অ্যাডিনোভাইরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। এটি একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যেখানে কাশি ২–৩ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় থাকতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষণস্থায়ী, তবে উপসর্গ বেশি হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি শ্বাসনালীর প্রদাহ তৈরি করে, যার ফলে শুকনো কাশি হয়।”
যদিও নিউমোনিয়া রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কমেছে, তবে তাপমাত্রার ওঠানামার কারণে অ্যাডেনোভাইরাস, মেটাপনিউমোভাইরাস ও রাইনোভাইরাস সংক্রমণ বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাইক্রোবায়োলজিস্ট চিকিৎসক ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী বলেন, “লক্ষণগুলি সাধারণত হালকা হলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অনেকেই প্রায় এক মাস পর্যন্ত শুকনো কাশিতে ভোগেন। এর চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী করা হয়। ঘনঘন বা ইচ্ছে মতো অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ খুবই জরুরি।”
ভাইরোলজিস্ট চিকিৎসক যোগীরাজ রায় আজকাল ডট ইনের মুখোমুখি হয়ে বলেন, “এই সময়টা খুব ঘনঘন কাশি জ্বর খুব লক্ষণীয়। এডিনোভাইরাসের প্রকোপও যথেষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়াও একাধিক নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ পর্যন্ত লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে সচেতন থাকতে হবে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দিনরাতের তাপমাত্রার বড় পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠছে। এবার এই ইনফেকশনের পরিমাণ অনেক বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে অন্যবারের থেকে। কাশি কমতে চাইছে না, কফ জমে যাচ্ছে, জ্বরটাও যথেষ্ট ভোগাচ্ছে, শরীর দুর্বল করছে। আবহাওয়ার তারতম্যের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছ রোপন করা এবং সবুজায়ন এই মুহূর্তে খুব জরুরী পরিবেশ দূষণ রোধ করতে। আর প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ঘ ঘনঘন না খাওয়া। অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হলে চিকিৎসকের অবশ্যই পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাল সংক্রমণের ফলে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ‘ভাইরাল কাশি’ হতে পারে। যদি কাশি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, তবে অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, তবে কোন অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়। গত দুই সপ্তাহে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হঠাৎ কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া বা একেবারে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গিয়েছে। এর সঙ্গে কাশি, শরীর ব্যথা ও হালকা জ্বরও রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন এড়ানো, ধুলো-ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার বা নেবুলাইজার ব্যবহার করা উচিত, বিশেষ করে যাঁদের অ্যাজমা সিওপিডি রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ইনহেলার বা নেবুলাইজার নিয়ম মেনে ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি ঘনঘন এন্টিবায়োটিক না খাওয়াটাই উচিত বলে মনে করছে চিকিৎসকরা।