• বেসমেন্টের চাবি কোথায়? খুঁজতেই কেটে গেল ৩৩ মিনিট! আর জি কর কাণ্ডের তদন্তে নয়া মোড়
    প্রতিদিন | ২৪ মার্চ ২০২৬
  • বেসমেন্টের চাবি আর জি কর হাসপাতালের সুপারের ঘরে, তা জানতেনই না নিরাপত্তারক্ষীরা। তাই তিন মিনিটের পথ পৌঁছতে লাগল ৩৩ মিনিট। ততক্ষণে নাগেরবাজারের অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১টি পাঁজরের হাড় ভাঙলেও, শরীরের ভিতরের প্রত্যঙ্গগুলি ফেটে গেলেও প্রায় এক ঘণ্টা তিনি বেঁচে ছিলেন। পুলিশের মতে, এভাবে চাবি খুঁজতে সময় নষ্ট না হলে তাঁর চিকিৎসা অনেক আগে শুরু হতে পারত। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মৃত্যু হয় ওই যুবকের। আর এই ‘অনিচ্ছাকৃত খুনের’ ঘটনায় ধৃত তিন লিফটম্যান ও দুই নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াও আরও কতজন যুক্ত রয়েছে, তার তালিকা তৈরি করছেন লালবাজারের গোয়েন্দারা। 

    সোমবার ফের আর জি করে ঘটনাস্থলে পৌঁছন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। ট্রমা কেয়ারের যে লিফটে অরূপের মৃত্যু হয়, সেটি আটকে ছিল ৬ তলা ও সাততলার মধ্যে। পিডব্লুডির আধিকারিকদের সামনেই চলে লিফটের পরীক্ষা। ইতিমধ্যে লালবাজারের গোয়েন্দারা অরূপের স্ত্রী সোনালি, বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন বন্ধু ও পরিজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এবার লিফট বিশেষজ্ঞ সংস্থা, লিফটের দেখভাল করার সংস্থাকে নোটিস পাঠাচ্ছে লালবাজার। যেহেতু কর্তব্যরত সিআইএসএফের জওয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল উঠেছে, তাই তাঁদেরও লালবাজার তলব করবে।

    মৃত অরূপের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশকে জানান, বেসমেন্ট থেকে তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূ বাঁচার জন্য চিৎকার করছিলেন। অরূপের কয়েকজন বন্ধু বেসমেন্টে নামতে গিয়ে দেখেন, গেটের তালা বন্ধ। তাঁরা নিরাপত্তারক্ষী, লিফটম্যান, হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী, সিআইএসএফ জওয়ানদের গেট খুলতে কাতর অনুরোধ করেন। কিন্তু তাঁদের জানানো হয়, পিডব্লুডির কাছে চাবি রয়েছে। তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পেরেছে, বেসমেন্টের চাবি যে আসলে হাসপাতালের সুপারের ঘরে রয়েছে, তা জানতেন না অনেক নিরাপত্তারক্ষীই। তাঁরা কোথাও চাবি খুঁজে পাননি। শেষ পর্যন্ত এক নিরাপত্তা আধিকারিক জানতে পারেন, সুপারের ঘরে রয়েছে সেই চাবি। রাতে সুপারের ঘরে এক ‘অ্যাটেনড্যান্ট’ থাকেন। কিন্তু রাতে তিনিও ঘুমোচ্ছিলেন। তাঁর খোঁজ করতে শুরু করেন কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী। ঘরের কাছেই তাঁকে পাওয়া যায়। তিনি উঠে চাবি খুঁজে নিরাপত্তারক্ষীর হাতে দেন। তখন প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। সেই চাবি দিয়েও সব তালা খোলেনি। অন্য পথে বেসমেন্টে পৌঁছন নিরাপত্তারক্ষীরা। লিফটের গর্ত থেকে অরূপ, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে উদ্ধার করা হয়।

    গোয়েন্দাদের মতে, তখন সময় ভোর ৫টা ৯ মিনিট। অরূপের স্ত্রী সোনালি গোয়েন্দা আধিকারিকদের জানিয়েছেন, যে লিফট উঠে যাওয়ার কারণে তাঁর স্বামীর দেহ পিষে যায়, সেই লিফটটি ফের নিচে গতের কাছে নেমে এলে তাঁদেরও পিষে দিত। তাই তাঁর ছেলেকে লিফটের গর্তের মধ্যেই তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে দেন সোনালি। উদ্ধারের পর ভোর ৫টা ১২ মিনিটে অরূপকে স্ট্রেচারে করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তার ১৮ মিনিট পরই অরূপের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি।

    গোয়েন্দা পুলিশের মতে, ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ লিফট ও দেওয়ালের মধ্যে পিষে আহত হন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পর লিফট আরও উপরে উঠতে গেলে তিনি নিচে বেসমেন্টের গর্তে স্ত্রীর সামনেই পড়ে যান। ওই অবস্থায় তিনি প্রায় ৪০ মিনিট শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন। তখন তাঁর স্ত্রী চিৎকার করে উদ্ধার করতে বলেন। উদ্ধার করার পরও অরূপের শরীরে প্রাণ ছিল। ফলে চিকিৎসকরাও তাঁর চিকিৎসার সুযোগ পাননি। এদিকে, ধৃত তিন লিফটম্যানই লালবাজারে জেরায় পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁরা চাইলেও নিয়ম ভেঙে সুপারের ঘর থেকে বেসমেন্টের চাবি নিতে পারতেন না, কারণ অ্যাটেনড্যান্ট তাঁদের দিতেন না। ওই চাবি একমাত্র নিরাপত্তারক্ষীরাই পেতে পারেন। একজন লিফটম্যান জেরায় জানান, তিনি অন্য একটি লিফটে করে বেসমেন্টে নেমে দেখেন, লিফটের দরজার সামনে রয়েছে গ্রিল। আবার একজন লিফটম্যান জেরায় জানিয়েছেন, তিনি উপরে লিফটের মেশিন রুমেও যান। কিন্তু একজন লিফটম্যান না জেনেই কেন লিফটের সুইচ টিপে তা তোলার চেষ্টা করেন, তা জানার চেষ্টা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
  • Link to this news (প্রতিদিন)