আইপ্যাক (I-PAC Case) মামলায় ইডির অভিযোগের বৈধতা এবং মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জোর সওয়াল সুপ্রিম কোর্টে। মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে উঠে এল লাদাখের পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের কেসের প্রসঙ্গও। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (CM Mamata Banerjee) আইনজীবী কপিল সিবাল মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ইডি কর্তাদের মামলার এক্তিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, ‘ইডি একটি সরকারি সংস্থা বা ডিরেক্টরেট মাত্র, কোনও স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা সংস্থাও নয়। তাই সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে তারা সরাসরি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দাবি তুলে মামলা করতে পারে না।’
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও বিচারপতি এন ভি অঞ্জারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চে এদিন ছিল মামলার শুনানি। এদিন মামলায় মুখ্যমন্ত্রী আইনজীবী কপিল সিবাল দাবি করেন, এখানে ইডি হল মামলাকারী ৷ তারা সংবিধানের আর্টিকেল ৩২ অনুযায়ী একটি মামলা করে আর একটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানোর দাবি জানাচ্ছে ৷ দু’টি বিষয় একেবারে ভিন্ন বলে দাবি করে ইডি-র আদৌ মৌলিক অধিকার আছে কি না তা খতিয়ে দেখার সওয়াল করেন সিবাল।
মামলার শুনানিতে আইনজীবী আরও বলেন, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২-এর অধীনে যে ব্যক্তি আদালতে আসেন, তাঁর কী ভাবে মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছে তা জানাতে হবে।’ এমনকী অন্যান্য আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে থাকলেও ইডির ডেপুটি ডিরেক্টর রবীন বনসল ছিলেন না বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর। এর পরেও কী ভাবে মৌলিক অধিকার নিয়ে আদালতে মামলা তা নিয়েও বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের এজলাসে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে যুক্তি হিসেবে হিসেবে সিবাল বলেন,‘এটা মৌলিক অধিকারের মামলা৷ কোনও জনস্বার্থ মামলা নয়৷ এখানে মামলাকারী ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হল কী করে ? উনি তো ঘটনাস্থলেই ছিলেন না৷ তাহলে মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হওয়ার প্রশ্ন উঠছে কী করে? এই ভদ্রলোক তাঁর অধস্তন অফিসারদের ঘটনাস্থলে যেতে বলেছিলেন।’ এখানেই শেষ নয়, তাঁর স্পষ্ট দাবি, ইডির আবেদনে দাবি করা হয়েছে তারা সংবিধানের ১৪, ২১ এবং ২২ ধারার উল্লেখ করে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। এখানে রবীন বনসলের কোনও মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হয়নি। ইডি ডিরেক্টরকে তিনি শ্যাডো অফিসার বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
সংস্থা হিসেবে ইডি-এর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বিচারপতি আঞ্জারিয়া বলেন, ‘মৌলিক অধিকার সব সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে হবে, এমন নয়। আইনের শাসন নিজেই একটি মৌলিক নীতি। তাই এর লঙ্ঘন হলে, সেটাও আদালতে তোলা যেতে পারে।’ এর পরেই সিবাল বলেন, ‘ইডি রাজস্ব দফতরের অধীনে পড়ে। এটি একটি ডিরেক্টরেট, আলাদা কোনও দপ্তর নয়। তারা ইচ্ছাকৃত ভাবে ইডিকে পিটিশনার (মামলাকারী) করেছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার অনুচ্ছেদ ৩২-এর অধীনে সরাসরি মামলা করতে পারে না। তারা কেবল অনুচ্ছেদ ১৩১-এর অধীনে মামলা করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যে তদন্ত হচ্ছে, সেটা রাজ্য সরকারকে দিয়ে করানো উচিত নয়। সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়ার জন্য আইনে তো আলাদা সংস্থান রয়েছে। তার পরে মৌলিক অধিকার চেয়ে মামলার কী প্রয়োজন।’ এখানেই শেষ নয়, সিবালের দাবি অনুযায়ী, ইডি যদি আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন বা PMLA-র অধীনে তদন্ত করতে গিয়ে অন্য কোনও অপরাধের কথা জানতে পারে, তা হলে ওই আইনের অনুচ্ছেদ ৬৬ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে, এই ক্ষেত্রে রাজ্যকে জানাতেই হবে।
অন্যদিকে, ইডি দাবি করেছে রাজ্য পুলিশ এই মামলার তদন্ত করতে পারে না। যা শুনে সিবালকে বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী যদি ইডির তদন্তে হস্তক্ষেপ করেন, তবে আপনার মতে ইডির কী প্রতিকার চাওয়া উচিত? তারা কি সেই রাজ্য সরকারের কাছেই যাবে—যার প্রধান নিজেই মুখ্যমন্ত্রী এবং সেখানে গিয়ে বিষয়টি জানিয়ে প্রতিকার চাইবে?’ এর পাল্টা সিবালের প্রশ্ন,‘আদালত কি এখনই ধরে নিচ্ছে যে, মুখ্যমন্ত্রী কোনও অপরাধ করেছেন?’ এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিচারপতি জানান, কিছুই ধরে নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এটাই অভিযোগ।
সিবালের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘আপনি বলছেন ইডি কোনও কর্পোরেট সংস্থা নয়, কোনও কোম্পানিও নয়, এমনকি আলাদা সরকারও নয়—শুধু সরকারের একটি ডিরেক্টরেট। তা হলে কি মৌলিক অধিকার নিয়ে কোনও সংস্থা মামলা করতে পারে না?’
এর পরেই সিব্বলের উদ্দেশে বিচারপতি মিশ্র বলেন,‘ইডি, ইডি করছেন। ইডির আধিকারিকেরাও তো মামলা করেছেন। তাঁরা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁদেরও কি মৌলিক অধিকার নেই? জবাব দিন। যে সব ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অন্যায় হয়েছে বলে অভিযোগ, তাঁদের মৌলিক অধিকারের দিকেও মনোযোগ দিন।’ এর পাল্টা মুখ্যমন্ত্রী আইনজীবী বলেন,‘এখানে ইডি কোনও ব্যক্তি নয়। মিঃ দিওয়ান আগেই এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন৷
এই রবীন বনসল-সহ সব অফিসারদের নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, ইডি নয়। এখানে ইডির মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হতে পারে না। কারণ ইডি এদের নিয়োগ করেনি। কেন্দ্রীয় সরকার আবার এই ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৩২ অনুযায়ী মামলা করতে পারে না। এখানে ইডির ডেপুটি ডিরেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থার ক্ষতি বলে বিবেচিত হতে পারে না।’
সিবালের মতে,‘ভোপালের মতো কোনও গ্যাস দুর্ঘটনা হলে সেখানে গণহারে মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করার বিষয়টি উঠে আসবে। আপনি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে অন্যদের হয়ে মৌলিক অধিকার ভঙ্গের অভিযোগে আর্টিকেল ৩২ ধারায় মামলা করতে পারেন না। একজন পুলিশ অফিসারের কাজে কেউ বাধা দিলে তিনি নিজে আর্টিকেল ৩২ মামলা করতে পারেন না। তা হলে সারা দেশের সব পুলিশ অফিসার আর্টিকেল ৩২ ধারায় মামলা করবে৷ বিধিবদ্ধ অধিকারে বাধাদানের অভিযোগ কখনও মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।’