মার্চ মাসের ২৪ তারিখ ঠিক রাত আটটা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ঘোষণায় গৃহবন্দি জীবন শুরু হয় দেশবাসীর। শুনশান রাস্তা, গণপরিবহণে তালা। করোনা ভাইরাসের দাপটে এক লহমায় বদলে যায় দেশবাসীর জীবন। একে একে অভিধানে যুক্ত হয় লকডাউন, সোশ্যাল ডিসটেন্স, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, নিউ নরমাল-এর মতো শব্দগুলি। একইসঙ্গে ফিরে আসে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার নিদারুণ কষ্টের স্মৃতি। চার বছর পেরিয়ে আবারও লকডাউনের আশঙ্কার সিঁদুরে মেঘ দেখছেন দেশবাসীর একাংশ। তবে কেন্দ্রের তরফে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
ভারতে ফের ট্রেন্ডিং সার্চের তালিকায় উঠে এসেছে ‘লকডাউন’। কিন্তু ঠিক চার বছর পরে হঠাৎ কেন আবার এই শব্দের অবতারণা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে করোনা আতঙ্ক বা চার বছরের বর্ষপূর্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচিত এই শব্দ।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই নতুন করে সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলির স্মৃতি ভেসে উঠেছে আমজনতার মনে। অবরুদ্ধ হরমুজ় প্রণালী ও যুদ্ধের জেরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের সঙ্কট কি আবার লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে? উদ্বেগ বাড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখে কোভিডকালের প্রসঙ্গও।
সোমবার লোকসভায় ইরান যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য রাখার সময়ে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা বোঝাতে কোভিডের প্রসঙ্গ টানেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। করোনাকালের কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সকলের এখন একজোট হয়ে সব রকম পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন, ঠিক যেমনটা আমরা কোভিডের সময়ে করেছিলাম।’ দেশে এলপিজি-সঙ্কট পরিস্থিতি বোঝাতেই এই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
কোভিড ছিল আন্তর্জাতিক সঙ্কট। যার চওড়া থাবা মানুষের ফুসফুসের সঙ্গে দুনিয়া জুড়ে অর্থনীতির উপরেও প্রভাব ফেলেছিল। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধেও আক্রান্ত বিশ্ব অর্থনীতির ‘ফুসফুস’ — গ্যাস এবং জ্বালানি তেল। যে সিস্টেমের ‘শ্বাসনালী’ হলো হরমুজ় প্রণালী। গোটা বিশ্বে গ্যাস এবং জ্বালানি তেল সরবরাহের হৃৎপিণ্ড বলা যেতে পারে পৃথিবীর এই প্রান্তকে। ইরান-ইজ়রায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের জেরে যা প্রায় থমকে যাওয়ার জোগাড়।
তবে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। জ্বালানি সরবরাহ বা অন্য কোনও কারণে লকডাউনের প্রয়োজন নেই। বরং নাগরিকদের সচেতনভাবে সম্পদের ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালে ‘লকডাউন’ নিয়ে হঠাৎ আগ্রহ বাড়ার কারণ নতুন কোনও বিপদ নয়—বরং কোভিড সময়ের স্মৃতি এবং বর্তমান পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া।
২০২০ সালের ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সারা দেশে ২১ দিনের সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। ২০২০ সালে ২৪ মার্চ দেশে মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০০। সেই দিন পর্যন্ত কোভিড ১৯ এর জেরে মৃত্যু হয় ৫০ জনের। সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লকডাউন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পরেই হঠাৎ করেই গোটা দেশ থমকে গিয়েছিল—রাস্তাঘাট ফাঁকা, কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের বাড়ি ফেরার লড়াই, এবং অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব কিছুই অনলাইন মোডে চলে যায়। সেই সময়ের ক্ষত এখনও বহু মানুষের মনে তাজা রয়েছে।
২০২৬ সালে এই দিনটির বার্ষিকী ঘিরেই ‘লকডাউন ইন ইন্ডিয়া’ (Lockdown in India 2026 Fact Check) নিয়ে হঠাৎ করে সার্চ বেড়ে যায়। কাকতালীয় ভাবে এক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোভিডকালের প্রসঙ্গ শুনে অনেকেই সার্চ ইঞ্জিনের কাছে জানতে চান, আবার কি লকডাউন হতে পারে? তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে লকডাউনের কোনও আশঙ্কা নেই বলে জানানো হয়েছে।