সিনেমার পর্দায় ‘ধুরন্ধর’ স্পাইদের দুর্ধর্ষ অ্যাকশন আর হাই-টেক গ্যাজেট দেখে কার না রক্তগরম হয়? মনে মনে অনেকেই হয়তো নিজেদের সেই এজেন্টের জায়গায় কল্পনাও করেন। কিন্তু কখনও কি মনে এই প্রশ্ন জেগেছে, কী ভাবে হওয়া যায় ‘র’ (R&AW)-এর এজেন্ট? আপনিও কি চাইলেই দেশের এই শীর্ষস্থানীয় গুপ্তচর সংস্থায় যোগ দিতে পারেন? বাস্তবের গুপ্তচরবৃত্তি কিন্তু সিনেমার পর্দার চেয়ে অনেক বেশি জটিল, মনস্তাত্ত্বিক, আর র-এর এজেন্টদের সামনে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না, বাইরে থেকে এতটাই অদ্ভুত রকমের সাধারণ তাঁরা।
কী ভাবে গুপ্তচর হওয়া যায়, তা জানার আগে বুঝতে হবে এই সংস্থাটির কাজ কী। ‘র’ বা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং কাজ করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) অধীনে। এটি ভারতের প্রধান বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা।
দেশের বাইরে কোথা থেকে ভারতের জন্য হুমকি রয়েছে তা শনাক্ত করা, কৌশলগত তথ্য সংগ্রহ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধির উপরে নজর রাখাই ‘র’-এর এজেন্টদের মূল কাজ।
তাঁরা তাঁদের কাজ সম্পর্কে চরম গোপনীয়তা বজায় রাখেন। অনেকেই সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে দ্বৈত জীবনযাপন করেন। অর্থাৎ, তাঁদের আশপাশের মানুষজন বুঝতেই পারেন না, তাঁরা আসলে ভারতীয় গুপ্তচর। এমনকী অনেকে এই ছদ্ম জীবনকে মান্যতা দিতে ভুয়ো বিয়ে-সংসারও করেন বলে শোনা যায়। তবে এই বিষয়ে কোনও প্রামাণ্য নেই।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আর পাঁচটা চাকরির মতো আপনি চাইলেই এখানে চাকরির আবেদন করতে পারবেন না। ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে নিয়োগের কোনও বিজ্ঞাপন বের হয় না, ফর্ম পাওয়া যায় না। সহজ কথায়, আপনি ‘র’-কে খুঁজে পাবেন না। আপনার মধ্যে সম্ভাবনা থাকলে ‘র’-ই আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবে।
২০২৫ সালে ‘গৌরব ঠাকুর শো’ পডকাস্টে লাকি বিস্ত নামে ‘র’-এর এক প্রাক্তন গুপ্তচর বলেছিলেন, ‘আমি জানতামই না যে আমার মূল্যায়ন করা হচ্ছে।’ সেনা বা অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সাধারণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার আড়ালেই চলে ‘র’-এর তীক্ষ্ণ নজরদারি। আপনি হয়তো জানেনই না, কিন্তু ‘র’ আপনাকে বেছে নিয়েছে। অথবা পছন্দ হয়নি বলে ফেলে দিয়েছে বাতিলের খাতায়!
‘র’-এ যোগ দেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট যোগ্যতামান নেই। তবে কিছু প্রাথমিক মাপকাঠি রয়েছে:
লাকি বিস্তের মতে, র-এর এজেন্ট হিসেবে নিয়োগের আগে যে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, তা কোনও সাধারণ প্রশ্নোত্তর পর্ব হয় না। এই ইন্টারভিউ সেশন তাঁর ভাষায়, একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ’। দু’ঘণ্টার মধ্যে হয়তো আপনাকে ৫০০টি প্রশ্ন করা হতে পারে!
‘আপনি কি রেগে যান?’, ‘আপনি কি রুটি পছন্দ করেন না ভাত?’—শুনতে সাধারণ মনে হলেও এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে প্রার্থীর মনস্তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা এবং সততা পরিমাপ করা হয়।
শুরুতে কোনও এক প্রশ্নের জবাবে আপনি হয়তো বললেন আপনি রাগেন না। কিন্তু পরের দিকে একটি উস্কানিমূলক পরিস্থিতিতে আপনি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে র জবাব দিলেন। আপনার জবাবে যে অসঙ্গতি আছে, তা ধরা পড়ে যাবে সেই সময়েই।
অনেকেই ভাবেন গুপ্তচর হতে গেলে সলমন খানের মতো পেশিবহুল বা জেমস বন্ডের ভয়হীন হতে হয়। কিন্তু লাকি বিস্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন, যতই সাহস থাকুক, কেউ সৎ না হলে তার দিকে ঘুরেও তাকায় না ‘র’।
‘র’ মনে করে কয়েক মাসের ট্রেনিংয়ে সাহসিকতা তৈরি করে নেওয়া যায়, কিন্তু চারিত্রিক ত্রুটি সারানো সম্ভব নয়।
এ ছাড়া গুপ্তচরদের যে কোনও পরিবেশে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা থাকতে হয়। সেটা কোনও কোটিপতির ড্রয়িংরুম হতে পারে, হতে পারে রাস্তার ধারের চায়ের দোকান। সব জায়গায়, সব পরিস্থিতিতে তাকে সাবলীল হতে হবে।
সাধারণত ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌসেনা, বায়ুসেনা), আধা-সামরিক বাহিনী, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (IB) থেকে সেরা অফিসারদের ডেপুটেশনে ‘র’-এ নেওয়া হয়। এমনকী সম্ভাবনা থাকলে অন্যান্য সরকারি পরিষেবা থেকেও অফিসারদের নেওয়া হয় ‘র’-তে। ‘র’-এর প্রাক্তন প্রধান বিক্রম সুদ যেমন ‘র’-এ যোগ দেওয়ার আগে ভারতীয় ডাক বিভাগের কর্তা ছিলেন।
তাই সিনেমার গ্ল্যামার ভুলে যান। সিনেমায় যেমন দেখা যায় নায়ক মনোলগ আওরাচ্ছেন বা অ্যাকশন করে ফাটিয়ে দিচ্ছেন, গুপ্তচরবৃত্তি মানে তা নয়। এই পেশা হলো আদতে নিরলস নজরদারি এবং চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেকে শান্ত রাখার এক কঠিন নিরলস পরীক্ষা।