এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: বিস্তর অপেক্ষার পরে সোমবার মাঝরাতে প্রকাশিত হয়েছে বাংলার ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ থাকা ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া ২৯ লক্ষ ভোটারের সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট। তাঁদের মধ্যে কাদের নাম ‘ডিলিটেড’ হলো এবং কাদের ভোটাধিকার রইল, সেটা মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত স্পষ্ট হলো না। বিক্ষিপ্ত ভাবে কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে ভোটাররা তাঁদের অবস্থা যাচাই করতে পারলেও বিধানসভা ভিত্তিক কতজনের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে রইল, আর কতজনের নাম বাদ পড়ল, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ তালিকা কমিশন এখনও প্রকাশ করেনি। রাজ্যের ৮০,৭১৯টি বুথেও এই তালিকা প্রকাশিত হয়নি। এ নিয়ে এ দিন মুখ খোলেননি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল অথবা কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত। দিল্লিতে কমিশনের ডিজি (আইটি) সীমা খান্নার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।
এ নিয়ে ধোঁয়াশার জেরে ভোটমুখী পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা যে ব্যতিক্রম, সেটা মানছে সুপ্রিম কোর্টও। এ দিন সুপ্রিম কোর্টে বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) নিয়ে মামলার শুনানি চলাকালীন সিজেআই সূর্য কান্ত বলেন, ‘দিন দুয়েক আগে একটা আর্টিকল দেখছিলাম, যেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলা ছাড়া অন্য কোথাও সার নিয়ে সমস্যা হয়নি৷ কোনও বিবাদও হয়নি৷ অন্য রাজ্যেও তো বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে!’ রাজ্যের তরফে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্তি দেন, অন্য রাজ্যে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ নিয়ে এত সমস্যা হয়নি। যদিও কমিশনের তরফে আইনজীবী ডি শেষাদ্রি নাইডু বলেন, ‘গুজরাটে আরও বেশি সংখ্যায় ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে।’ শুধু ভোটার নন, ‘বিচারাধীন’দের মধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন দলের যে ১৪ জন প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ধন্দ এ দিন কাটেনি।
সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়ে মঙ্গলবার কমিশনকে বিঁধেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এ দিন উত্তরবঙ্গে যাওয়ার আগে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘কালকে মধ্যরাতে কেন বেরোবে (সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট)? এখনও পর্যন্ত বুথে টাঙানো হয়নি, বুথে, ব্লকে, জেলায় টাঙানো হয়নি? ২২০ জন মারা গিয়েছে। এত ভয়টা কীসের? যেটুকু নাম উঠেছে সেটা আমার কোর্টে কেস করার জন্য। লিস্ট বের করতে ভয় কেন? মানে স্বচ্ছতা নেই।’ তাঁর সংযোজন, ‘জজেরা অনেকদিন আগেই করে দিয়েছেন? আপনারা কেন আরও ছ’দিন সময় নিলেন? আপনারা কি একতরফা আরও নাম বাদ দিয়েছেন? আপনারা কি শুধু কোনও একটা পার্টির নাম তুলেছেন? সেটা তালিকা বেরোলে বোঝা যাবে।’ আবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক পাথরপ্রতিমার সভা থেকে েদলের নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, যাঁদের নাম সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে বাদ যাবে, তাঁরা প্রত্যেকে যাতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে পারেন, তার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টে এ দিন শুনানি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান আদালতের উদ্দেশে আর্জি জানান, তাঁরা বাংলার ‘সার’ নিয়ে আরও কিছু নির্দেশ চাইছেন। কারণ, ছ’টি রাজনৈতিক দলের অন্তত ১৪ জন প্রার্থীর নাম ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ লিস্টে আছে। দ্রুত তাঁদের বিষয়টির ফয়সালা না–হলে তাঁরা মনোনয়ন জমা দিতে পারবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, ভোটমুখী বাকি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির সঙ্গে বাংলার ফারাক হলো, অন্য কোথাও ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ তালিকাভুক্ত ভোটারের বিষয়টিই ছিল না। সেখানে ‘আনম্যাপড’ ও ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকাভুক্ত ভোটারদের শুনানি শেষে নথি ঝাড়াইবাছাই করে একাংশের নাম উঠেছে, বাকিদের নাম বাদ গিয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে ৬০,০৬,৬৭৫ জন ভোটারের ক্ষেত্রে ইআরও–এইআরওর সিদ্ধান্তের সঙ্গে কমিশনের অবজ়ার্ভারদের সিদ্ধান্ত মেলেনি। সেই বিবাদের নিষ্পত্তির জন্যই বেনজির ভাবে সুপ্রিম কোর্টকে এই সব নথির নিষ্পত্তির জন্য জুডিশিয়াল অফিসার বা বিচারকদের দায়িত্ব দিতে হয়েছে।
এখনও পর্যন্ত তৃণমূল, বিজেপি, বামেরা যে ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে গোয়ালপোখরের তৃণমূল প্রার্থী গোলাম রব্বানি, শ্যামপুকুরে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা, জঙ্গিপুরে জাকির হোসেন, আউশগ্রামের বিজেপি প্রার্থী কলিতা মাজির মতো বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম ছিল ‘বিচারাধীন’ তালিকায়। ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির নামও এই লিস্টে ছিল। তিনি নিজেও সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন। এ দিন দিওয়ান যুক্তি দেন, এই ধরনের প্রার্থীদের নথির নিষ্পত্তির বিষয়টি আগে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক। সিজেআই জানান, সংশ্লিষ্ট সবক’টি রাজনৈতিক দল একযোগে এই ব্যাপারে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন। কল্যাণ অভিযোগ করেন, ‘সাপ্লিমেন্টারি লিস্টের একটা অংশ গতকাল মধ্যরাতে জারি করা হয়েছে৷ পুরো লিস্ট বের করা হয়নি৷’ বেঞ্চের অন্য সদস্য বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে, বুধবার পুরো সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশিত হতে পারে৷’ সিজেআই সূর্য কান্ত জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি গোটা বিষয় দেখছেন৷ কমিশনের কৌঁসুলির বক্তব্য, ‘আমরা কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, প্রয়োজনে প্রতিদিন সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করা হোক৷’ বিচারপতি বাগচী আবেদনকারীর বক্তব্যের ভিত্তিতে জানান, যে আসনগুলিতে মনোনয়ন আগে করতে হবে, সেখানকার ভোটারদের নথি যাচাই আগে করা হোক৷ তাঁর কথায়, ‘এটা দোষারোপের সময় নয়। কমিশনকে বলব, যাতে ধাপে ধাপে কাজ শেষ করা যায়, সে জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর টিমকে সাহায্য করতে। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে আমরা নিশ্চিত করব, গণতান্ত্রিক অধিকার যেন সুনিশ্চিত করা যায়।’
রাজ্যের আর এক আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী আদালতে আর্জি জানান, যাতে বাংলায় ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ়িং’–এর (নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার শেষ সময়সীমা) তারিখ আরও বাড়ানো হয়৷ বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘এটা আমরা অবশ্যই বিবেচনা করব৷’ সব পক্ষের উদ্দেশে তাঁর মন্তব্য, ‘আপনারা একবার ভাবুন ৬০ লক্ষ লোকের নথি যাচাই করার কাজ আমরা দিয়েছি জুডিশিয়াল অফিসারদের, তাও মাত্র ৪৫ দিন সময়সীমার মধ্যে৷ এটা অমানবিক কাজ৷ বাংলার সমস্যা ইউনিক, অন্য রাজ্যের সমস্যাও আলাদা৷’ সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে যে ভোটারদের নাম বাদ পড়বে, তাঁদের আবেদনের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টিও শুনানিতে ওঠে। সিজেআই বলেন, ‘প্রাক্তন বিচারপতি এবং বিচারকরা যাঁরা ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন, তাঁদের কোথায় বসে কাজ করতে সুবিধা হবে, সেটা দেখুন৷ কলকাতার জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমিতেও এঁরা কাজ করতে পারেন৷’ ১ এপ্রিল বাংলার ‘সার’ সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি৷