কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
শারীরিক ভাবে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্নদের জন্য অ্যাপ–ক্যাবে হুইলচেয়ার এবং অন্যান্য সহায়ক যন্ত্র রাখার উপরে বিশেষ জোর দিল সুপ্রিম কোর্ট। সম্প্রতি শিবজিৎ সিং নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় সর্বোচ্চ আদালত এই পরামর্শ দিয়েছে।
শহরাঞ্চলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের যে সব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তা তুলে ধরতে মামলাটি করেছিলেন শিবজিৎ। তারই প্রেক্ষিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ, দেশের মহানগরগুলিতে এই ধরনের ক্যাবের উপরে নির্ভরতা বিপুল ভাবে বাড়ছে। আদালতের মতে, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্নদের সুবিধের জন্য ক্যারিয়ার বা বিশেষ ভাবে পরিবর্তিত (মডিফায়েড) ক্যাব ব্যবহার করা উচিত, যাতে তাঁদের এবং প্রবীণ নাগরিকদের যাতায়াত সহজতর হয়। বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে এই মামলাটি রয়েছে।
মামলায় জানানো হয়েছিল, গণপরিবহণ ব্যবহার করতে গেলে যাত্রীদের ‘ফার্স্ট’ ও ‘লাস্ট মাইল’ — অর্থাৎ বাড়ি থেকে বাস স্ট্যান্ড বা রেল স্টেশন চত্বর এবং সেখান থেকে মূল গন্তব্যে (অর্থাৎ বাস বা ট্রেন) পৌঁছনোর পথটুকু অতিক্রম করতে হয়। যাঁরা ভালো ভাবে চলাফেরা করতে পারেন না, তাঁদের পক্ষে ওইটুকু দূরত্ব পার করা খুব কষ্টসাধ্য। অনেক ক্ষেত্রে হুইলচেয়ার নিয়ে ক্যাব পর্যন্ত এলেও অন্য সমস্যা তৈরি হয়। কারণ গাড়িতে হুইলচেয়ার রাখার জায়গা থাকে না। সিএনজি–চালিত গাড়িতে বড় সিলিন্ডার প্রায় পুরো বুট স্পেস দখল করে রাখে। ফলে হুইলচেয়ার বা অন্যান্য সহায়ক যন্ত্র রাখার জায়গা থাকে না। এই কারণেই নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবায়িত করা যায় না বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারীর আইনজীবী। তিনি প্রস্তাব দেন, ক্যাবের জন্য একটি ‘ইউনিভার্সাল ডিজ়াইন’ থাকা উচিত, যাতে বিশেষ ভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন বা প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।
এই যুক্তিতে সহমত হয়ে বিচারপতি মেহতা বলেন, ‘আমাদের এই মানুষগুলোকে সাহায্য করার উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। বড় বড় শহরে সর্বত্র ক্যাব রয়েছে। সেই ক্যাব সংস্থাগুলিকেও বলা উচিত যাতে তারা হুইলচেয়ার বা সহায়ক যন্ত্র রাখার ব্যবস্থা করে।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলোছেন, ‘ধরা যাক এক জন মানুষের বাড়ি প্রধান সড়ক থেকে এক কিলোমিটার দূরে। তিনি একটি স্বয়ংক্রিয় হুইলচেয়ারে করে ক্যাব পর্যন্ত এলেন। এ বার সেটি কোথায় রাখবেন? যদি ক্যাবে করে নেওয়া না যায়, তা হলে তিনি কী ভাবে যাবেন?’
প্রাথমিক ভাবে সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব, ক্যাব বুকিংয়ে এমন একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকা উচিত, যেখানে হুইলচেয়ার-সহায়ক ক্যাবের অপশন থাকবে। এ ছাড়া সিএনজি ক্যাবেও যাতে হুইলচেয়ার বা সহায়ক যন্ত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার জন্য গাড়ির বাইরে ক্যারিয়ার বা ভিতরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছে কোর্ট। দেওয়া হয়েছে ইউরোপের বহু শহরের মতো সর্বজনীন নকশা (ইউনিভার্সাল ডিজ়াইন) চালু করার পরামর্শও।
এ প্রসঙ্গে শীর্ষ কোর্টকে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, গণপরিবহণে সামগ্রিক অ্যাক্সেসিবিলিটি নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি কমিটি কাজ করছে। অ্যাপ ক্যাব–চালকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স’–এর পূর্বাঞ্চলীয় শাখার পক্ষ থেকে ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওলা এবং উবর দুটোই আন্তর্জাতিক সংস্থা। তারা চাইলেই এমন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। এ ছাড়া হুইলচেয়ার প্রায় সবই ফোল্ড করা যায়। ফলে যাত্রীকে গাড়িতে বসিয়ে দেওয়ার পরে চালকরাই হুইলচেয়ার গাড়িতে তুলে দিতে পারেন।’